উন্নয়ন মৃত্যু

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: ফার্নিচার দোকানের কাঠমিস্ত্রি মোহাম্মদ স্বপনের পরিবার এই বলে সান্ত্বনা পেতে পারে যে, তিনি উন্নয়নের জন্য জীবন দিয়েছেন। মালিবাগ রেলগেট এলাকায় নির্মাণাধীন উড়ালসড়কের (ফ্লাইওভার) গার্ডার ধ্বসে নিহত হয়েছেন তিনি। এই উড়ালসড়কটি নির্মাণ করতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে কার্যত অচল করে রাখা হয়েছে মৌচাক, মালিবাগ, মগবাজার, শান্তিনগর এলাকাকে। রাস্তাগুলো এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বড় বড় গর্তের ভেতর গাড়ী, রিকশা, টেম্পো চলতে গিয়ে প্রতিদিনই ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। এবার গার্ডার ধ্বসে পড়লো যেমন করে কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামে এমনভাবে উড়ালসেতুর গার্ডার ধ্বসে মারা গিয়েছিল কয়েকজন।
নানা ধরণের মৃত্যু আছে। প্রতিনিয়তই মরছে মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনাতো গণহত্যার পর্যায়ে চলে গেছে। এখন দেখছি আমরা এই ‘উন্নয়ন মৃত্যু’।
প্রধানমন্ত্রী রোববার গিয়েছিলেন চট্টগ্রাম। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা দেখে তিনি হতাশার কথা উচ্চারণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী চট্টগাম দেখেছেন, কিন্তু খোদ রাজধানীর বেহাল দশা দেখেননা হয়তো। পুরো শহর কেটে রাখা হয়েছে। এমনকি কূটনৈতিক এলাকা গুলশানের প্রায় সব রাস্তা কেটে ফেলে রাখা হয়েছে মাসের পর মাস। উন্নয়নের নামে মানুষকে যন্ত্রণা সইতে হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। রাস্তায় বড় বড় খানাখন্দ তৈরি হওয়ার কারণে দশ মিনিটের পথ এখন দুই-তিন ঘণ্টাতেও পৌঁছানো যাচ্ছে না।
এমন অবস্থা রাজধানী ঢাকায় বেশি, তবে অন্যান্য শহরেও কম নেই। যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন ও নির্মাণ করতে গিয়ে প্রায় স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে রাজধানীকে। বছরের পর বছর চলে যায়, কিন্তু কাজ শেষ হয় না। কাজ শেষ হয় না, আবার প্রকল্প ব্যয়ও বেড়ে যায় যেমন করে কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে মগবাজার মৌচাক ফ্লা্ইওভারের প্রকল্প ব্যয়। কোথাও কোন স্বচ্ছতার বালাই নেই। প্রায় সব উন্নয়ন প্রকল্পের একই অবস্থা। সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে ভুল পরিকল্পনা, দুর্নীতি ও ঘাপলা, ত্রুটি বিচ্যুতি, গোঁজামিল সম্পর্কে সবাই জানে। কিন্তু কারো বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেই।
নিয়ম হলো ঠিকাদার তার নির্মাণ সামগ্রী নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নির্মান এলাকার বাইরে রাখবেন। কিন্তু এখানে মূল সড়কের উপর ফেলে রেখে যান ও মানুষ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে কাজ করেন ঠিকাদার। তাকে কিছুই বলা হয় না। আর কাজের মান নিয়েতো প্রশ্ন আছেই। সড়কের কাজ শেষ হওয়ার পর মাস না যেতেই রাস্তার পিচ উঠে যায়, খানাখন্দ ও গর্তের সৃষ্টি হয়। আর বর্ষা বাদল এলেতো কথাই নেই। উন্নয়নের নামে হরিলুট হয় এভাবেই। একই কাজ করা হয় কয়েক দফায়, বারবার। কারণ, প্রকৌশলী, ঠিকাদার, আমলা, রাজনীতিক মিলে এমন এক চক্র তৈরী হয়েছে যে, এরা সকলেই বন্ধু ব’নে গেছে। দেশব্যাপী সড়ক অবকাঠামোর প্রভূত উন্নতি হলেও সংকট কাটছে না। ঘুরে ফিরে একই রাস্তা-সড়ক-মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণের উন্নয়নে সীমাবদ্ধ থাকছে।
দেশ উন্নয়নের পথে হাঁটছে বলে গর্ব করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু উন্নয়নের নামে এই মৃত্যু, এই দুর্ভোগ কতটা সাধারণ মানুষকে ছুঁতে পারছে? জনগণ কি সত্যিই অনুভব করছে যে উন্নয়ন হচ্ছে? মানুষের সাথে কথা বললে দেখা যাবে তারা চরম বিরক্ত। সব কিছুর একটা সুস্থতা আছে। উন্নয়ন কাজেরও তাই থাকা প্রয়োজন। রাস্তাঘাট বন্ধ রেখে, মানুষকে কষ্ট দিয়ে উন্নয়ন হলে তা মানুষ গ্রহণ করে না। উন্নয়ন মানুষের জীবন-জীবিকাকে কতটা সরাসরি স্পর্শ করছে তার হিসেব করতে হবে। চট্টগ্রাম শহরে কোটি কেটি টাকা খরচ করে উড়ালসেতু বানানো হয়েছে, কিন্তু এটি কেউ ব্যবহার করে না। এর অর্থ হলো, এর আসলে প্রয়োজনীয়তাই যাচাই করা হয়নি। ভাবনার মধ্যে ছিল ‘প্রকল্প বানাও, টাকা কামাও’।
দলীয় নেতা নেত্রীরা উন্নয়নের অনেক পরিসংখ্যান দিতে পারবেন, কিস্তু সাধারণ মানুষের কাছে পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার নিজের অভিজ্ঞতা। যেভাবে তারা কষ্ট করছেন তার পরিমাপ হয় না শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে।
মানুষ জানে উন্নয়নের ফসল যতটা তাদের জন্য, তার চেয়ে অনেক বেশি মুষ্টিমেয় কিছু লুটেরার জন্য। উন্নয়নের নামে লুটতরাজের কাহিনী সবাই জানে। আমাদের তৃপ্তি আছে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে। বিতর্ক থাকলেও সরকার বলছে প্রবৃদ্ধির হার এখন সাত শতাংশ। কিন্তু এমন প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার অনেক কম। অর্থনীতিবিদরা এই প্রবণতাকে বলছেন, ‘জবলেস গ্রোথ’ বা ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি’। এই প্রক্রিয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলো বৈষম্যের বৃদ্ধি এবং আমরা তা দেখছি। বর্তমান উন্নয়ন মডেলে সম্পদ মুষ্টিমেয় ব্যক্তি ও পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে এবং ‘পাওয়া-না-পাওয়া’ মানুষের মধ্যে বৈষম্য ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এরূপ ‘যাতনাময়’ উন্নয়ন আর কতদিন চলবে, তা কি কেউ বলতে পারেন?
মালিবাগের ঘটনা অগ্রহণযোগ্য। মানুষের প্রাণের মূল্য দিতে না পারলে উন্নয়ন করে কোন ফল লাভ হবে না। ঠিকাদার, তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থাসহ যাদের গাফিলতিতে এমন ঘটনা ঘটল, তাদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। দরিদ্র বলে নিহত আর আহতের পরিবারকে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে যেন ঘটনার সমাপ্তি টানা না হয়।
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন।
ishtiaquereza@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *