নারীর ক্ষমতায়ন বনাম বিশেষ বিধান

আইনুদ সনি: তখন ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হয়েছি সবেমাত্র। কাজিন এবং প্রায় কাছাকাছি বয়সী চাচা ফুপুরা সব একসাথেই বগুড়া শহরে একই বাড়ীতে মানুষ হয়েছি। হঠাৎ একদিনের কথা… বাবার ফুপাতো বোন, বয়স ১২-১৩ বছর হবে… বেড়াতে এসেছে তার বাবা মা’র সাথে। বাসায় মেহমান আসলে এমনিতেই আনন্দের সীমা নেই… পড়তে বসতে হবে না বলে। তারপরও নাকি আরও মেহমান আসবে। আসুক… মেহমান আসলে বাসায় খাওয়া-দাওয়াও খুব ভালো হয়… উপরন্তু বাইরের মানুষজন থাকলে পরিবারে শাসন থেকেও বেঁচে যাওয়া যায়!
আমার সেই ১২ বছর বয়সী ফুপুকে শাড়ী পরিয়ে দেয়া হলো… শুনলাম, তাকে দেখতে আসবে ছেলেপক্ষ। খুবই মজার বিষয়। এরপর কে যেনো আসলো (কোন চাচাই হবে… স্পষ্ট মনে নেই)। আমরা যতগুলো মেয়ে ছিলাম, সবাইকে একটা ঘরে তুলে দরজা আটকে শাসিয়ে গেলো যে মেহমান চলে না যাওয়া অবধি যেন বের না হই। কেন কিছুই বুঝতে পারলাম না… কিন্তু তার মুখের উপর কিছু্ই বলতে পারলাম না। আমরা ৭-৮ জন মেয়ে দরজা জানালার ফুটো দিয়ে বাইরে দেখার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছি। আমাদেরকে পাহারা দেয়ার জন্য এক দাদীকে রেখে গেলো। দাদী একা একাই বিড়বিড় করছেন বগুড়ার ভাষায় যার অর্থ হলো, এলাকার বখাটেদের খুব উৎপাত, তাই নাকি ফুপুকে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
প্রায় একদেড় ঘন্টা যাবত আমরা ফিসফিস করে কথা বলছি একে অপরের মধ্যে। তবে এটা বুঝতে পারছি না যে আমাদেরকে কেন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। দাদী অবশ্য রসিকতা করা শুরু করলেন, ‘যাঁই বাইরে যাবু, তাকই লিকা দিমু,’ যার অর্থ হলো, যে বাইরে যাবার চেষ্টা করবে তাকেই বিয়ে দিয়ে দিবেন। আমরা একথা শুনে আর ঘর থেকে বের হতে চাইলাম না। আমাদেরকে যখন বের করা হয়, তখন শুনতে পারলাম যে কনে ছাড়া নাকি অন্য কোন মেয়ে সামনে যেতে নেই…। … শুনলাম, আমার সেই ফুপুর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। বিয়েটা তাদের গ্রামের বাড়ী থেকেই হয়েছিলো। কিন্তু বছর খানেক পরেই সেই বউ থাকা সত্ত্বেও আরেকটা বিয়ে করেছিলো ফুপুর প্রাপ্তবয়স্ক বর। এভাবে অবচেতনভাবে একটি বাল্যবিবাহ হতে এবং তা ভেঙে যেতে দেখেছিলাম। আর, আমাদেরকে আটকে রাখার বিষয়টিও তখন বোধগম্য না হলেও পরবর্তীতে বড় হয়ে বুঝেছি।
এবার আসি বড়বেলায়…। আরও একটি বাল্যবিবাহ….! তেরো বছর বয়সী পাপড়ি (ছদ্মনাম) ছোটভাই আর বাবা মায়ের সাথে থাকতো গাজীপুরে। বাবা গাজীপুরের কোন এক গার্মেন্টেসে চাকরি করতো। হঠাৎ বাবার চাকরি চলে যায়, মাও গৃহিনী। সংসার চলা কঠিন হয়ে পড়ে। এদিকে, পাপড়ির স্কুলে যাতায়াতের পথে এলাকার এক যুবকের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি তার বাবা মা। জানতে পেরে তাড়াহুড়ো করে তাদের গ্রামের বাড়ী খুলনায় নিয়ে গিয়ে সম্পর্কের বিষয়টি গোপণ রেখে অন্য ছেলের সাথে বিয়ে দেয় তাকে। কনের আইনগতভাবে বিয়ের বয়স আরও পাঁচ বছর পরে হবার কথা থাকলেও, মেয়ে বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চান বাবা-মা। তার মা-বাবার ধারণা ছিলো, বিয়ে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। মেয়ের মতামতের তোয়াক্কা না করে বিয়ের কাবিননামায় কনের বয়স ১৮ বছর দেখিয়ে বিয়ে দেয়। সাক্ষী দেয় কাছের আত্মীয় স্বজন। বিয়ের খরচ যোগাতে ধারদেনা করেই ক্ষান্ত হননি তারা, বিক্রি করে দেন পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমিজমাও। সামর্থ্য না থাকলেও বিয়েতে মোটা অংকের যৌতুকও দেন তারা। লক্ষ্য একটাই… সব নিয়ে বাঁচা যায়, কিন্তু কন্যার দায় (?) নিয়ে বাঁচা যায় না। সবকিছুকে পেছনে ফেলে বিয়েটা তারা দিয়ে দেন। কিন্তু বিয়েটা তিনমাসও টিকতে পারেনি। পাপড়ির বাবা মা অনেক চেষ্টা করেও সবকিছু ঠিকঠাক করতে ব্যর্থ হন।
বাংলাদেশে হরহামেশাই পাপড়ির মতো এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বেআইনীভাবে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন অভিভাবকরা। যা বাংলাদেশের আইন মোতাবেক শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে এমন শাস্তিযোগ্য অপরাধকে বৈধতা দিতে বাংলাদেশ সরকার বিশেষ প্রেক্ষাপটে আদালতের নির্দেশ নিয়ে এবং মা-বাবার সমর্থনে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদেরও বিয়ের সুযোগ রেখেছে। সরকার বলছে এতে নাকি মেয়েদের সম্মান বাঁচবে!
গত ৮ ডিসেম্বর ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬’ শীর্ষক বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন হয়েছে। প্রায় ৯০ বছরের পুরনো আইনটি যুগোপযোগী করার উদ্যোগকে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে স্বাগত জানানো হয়। তবে এ আইনের ১৯ ধারায় একটি বিশেষ বিধান যোগ করা হয়েছে। এ বিশেষ বিধান রেখে আইনটি পাস করা হলে তা শিশু অধিকার আইন ও আন্তর্জাতিক সনদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। কারণ জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ (সিআরসি) ও দেশের প্রচলিত শিশু আইনে বয়স ১৮ বছরের কম হলে তাকে শিশু বলা হয়।
এর আগে, গত ২৪ নভেম্বর ২০১৬-এ বাংলাদেশের সরকার বিয়ের জন্য মেয়েদের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর বয়স হওয়ার শর্ত রেখে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন’ অনুমোদন দিয়েছে। বাল্যবিবাহ কমানোর জন্যে এই আইনে কঠিন সাজা অর্থাৎ জেল ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে এবং সাজার পরিমাণ এর সাথে জড়িত থাকার পরিমাণের উপর নির্ভর করছে।
এই বিশেষ প্রেক্ষাপটে’ মেয়েদের বিয়ের বয়সে ছাড়ের সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সেই নভেম্বর মাস থেকেই চলছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে সমাজে ধর্ষণ ও বাল্যবিবাহের মাত্রা বাড়বে বলে অনেকেই আশংকা করেছেন।
বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০০৭ এর তথ্যমতে, দেশে নারীর বিয়ের গড় বয়স ১৫ বছর তিন মাস। ২০ বছর হতে ২৪ বছর বয়সের নারীদের মধ্যে যাদের ১৮ বছরের মধ্যে প্রথম বিয়ে হয় তাদের শতকরা হার ৬৬ শতাংশ। যা ২০০৪ সালে ছিল ৬৮ শতাংশ।
বাল্যবিবাহের মূলে রয়েছে দারিদ্র্যতা, নারীদের নিরাপত্তা এবং অশিক্ষা, যা নারীকে স্বাবলম্বী হতে দেয় না। বাল্যবিবাহের শিকার নারীরা অল্প বয়সে সন্তানের মা হয়ে যান এবং বিভিন্ন ধরণের অসুস্থতায় ভুগে এবং দাম্পত্য সহিংসতার শিকার হন। পরিবার ও সমাজে তারা থাকেন চরম অবহেলিত, লাঞ্ছিত। তাদের পরিবার ও সমাজ থেকে ভুল শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং তার প্রতিফলন ঘটে তার নিজের মেয়েকেও যখন একইভাবে বাল্যবিবাহের শিকার হতে হয়, তখন তারা সেইটাই সঠিক বলে মনে করেন। সমাজের বিরোধীতা না করে কন্যাসন্তান নামক বোঝা তাদের জীবন থেকে বিদায় করতেই বেশী তৎপর থাকেন। অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়াটাকেই তারা যুক্তির কাজ মনে করেন। বিআইটিএ-এর একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবকরাই সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দেয়।
বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সমালোচনার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছুদিন আগে জাতীয় সংসদে বক্তব্য রেখেছেন। সেখানে তিনি দেশের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেই এটা করা হয়েছে জানিয়ে বলেন:
‘যারা প্রশ্ন করছেন, তাদের গ্রামের পারিবারিক মূল্যবোধ ও সমস্যা সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা নেই। রাজধানীর পরিবেশ দেখেই তারা আইনটিকে বিবেচনা করছেন। আমরা ১৮ বছর পর্যন্ত বিয়ের বয়স নির্ধারণ করে দিয়েছি। কিন্তু একটি মেয়ে যে কোন কারণে যদি ১২-১৩ বা ১৪-১৫ বছর বয়সে গর্ভবতী হয়ে যায় –তাকে গর্ভপাত করানো গেলো না। তাহলে যে শিশুটি জন্ম নেবে তার অবস্থান কী হবে? সমাজ কি তাকে গ্রহণ করবে? ছেলেদের ২১ আর মেয়েদের ১৮ ঠিক রেখে প্রয়োজনের তাগিদে এই শর্ত শিথিল করে নতুন যে বাল্য বিবাহ আইন করা হয়েছে তা সময়োপযোগী।’
অথচ ২০১৪ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত গার্ল সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ১৮ বছরের নিচে বাল্যবিবাহ বন্ধের ব্যবস্থা করবেন।
মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম এ আইনের বিশেষ বিধানের বিরোধিতা করে বলেন, রাষ্ট্রে চালকের ভূমিকা থেকে শুরু করে গোটা দেশকে অগ্রসর করার ক্ষেত্রে নারীরা ভূমিকা রাখেছে। কাজেই রাষ্ট্র, সরকার বিশেষ বিধান রেখে নারীর বিয়ের বয়স ১৮ রাখার কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
পরিশেষে বলা যায়, এই শর্ত শিথিল করা হলে অভিভাবক ও পরিবারের উপর সিদ্ধান্তের আইনী বৈধতা দিয়ে মেয়েদের আত্মসম্মানবোধ ও নারী-অধিকারকে অপমান করা হয়েছে। আর ধর্ষণের কারণে গর্ভধারণ হলেও বাবা-মা বা তার পরিবার সাথে থাকলে, সেই মেয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। বিকৃত চিন্তার মানুষ সম্বলিত সমাজের কাছে মাথা নত করে ধর্ষককে বিয়ে করতে নারীকে আর কেউ বাধ্য করতে পারবে না। এই আইনের প্রয়োগ শুরু হলে ইভ টিজিং এর শিকার নারীদের দ্রুত বিয়ের আয়োজন করেই অভিভাবকরা তাদের দায়িত্ব শেষ করতে পারবেন। বোনাস হিসেবে তাদের আইনগত শাস্তিও মওকুফ হয়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে সমাজে অল্পবয়সী নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাবে।
যেখানে নারীদিবসের অনুষ্ঠানগুলিতে নারীর ক্ষমতায়নের কথা, শিশু অধিকারের কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা উঠে যাচ্ছে, সেখানে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের বিশেষ এই বিধানের মতো বিস্তর ফারাক রেখে আমরা কি স্ববিরোধীতা করছি না? … এ আইনের বিশেষ বিধান অবিলম্বে বাতিলের দাবী জানাচ্ছি।
আইনুদ সনি : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
ainudsony@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *