রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ আগুন

সহিদুল ইসলাম রেজা, টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা : রাজধানীর মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট। বুধবার দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে পাঁচ শতাধিক বস্তি ঘর। কড়াইল বস্তির আগুনের ঘটনার তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের ডেপুটি ডিরেক্টরকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত বুধবার দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর মহাখালী এলাকার কড়াইল বস্তিতে এই আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। বস্তির ‘আদর্শনগর’ এলাকায় সূত্রপাত আগুনের। সেখান থেকে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে কুমিল্লা পট্টিসহ পাঁচটি স্থানে। ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিটের প্রায় পাঁচ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় সকাল সোয়া ৭টায় নিয়ন্ত্রণে আসে এই আগুন। কিন্তু এরই মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে পাঁচ শতাধিক ঘর।
গত রাতের আঁধারে আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বাঁচতে গায়ের কাপড়টি ছাড়া আর কিছুই নিয়ে বের হতে পারেননি এসব ঘরের কয়েক হাজার বাসিন্দা। নিজেদের জীবন বাঁচানো সম্ভব হলেও উপার্জিত অর্থ, সংসারের আসবাবপত্র, ঘর কিছুই রক্ষা করতে পারেননি তারা। চোখের সামনে পুড়ে ছাই হতে দেখেন নিজেদের সবকিছু। সেইসঙ্গে পুড়তে দেখেন নিজেদের স্বপ্ন। তাদের আর্তনাদ আর আহাজারিতে তখন ভারী বাতাস।
কড়াইল বস্তির আগুনে সব হারানো মানুষদের একজন ইলিয়াস। পেশায় রিকশাচালক। তিনি বলেন, প্রথমে আগুন লাগে আদর্শনগরে। পরে তা কুমিল্লা পট্টি, পুরান পট্টি, তালতলা ও কাঠপট্টিতে ছড়িয়ে পড়ে। ‘আগুন, আগুন’ চিৎকার শুনে ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে কোনোমতে ঘর থেকে বের হয়েছি। সঙ্গে কিছুই নিতে পারি নাই। দূর থেকে চেয়ে চেয়ে দেখছি শুধু। দেখতে দেখতে সব পুইড়া গেল।’
বস্তির পুড়ে যাওয়া একটি ঘরের পাশে কথা হয় খাদিজা বেগম ও তার মেয়ে রাহেলার সঙ্গে। খাদিজা অন্যের বাসায় কাজ করেন। আর রাহেলা কাজ করেন একটি গার্মেন্ট কারখানায়। তিন বছর ধরে এই বস্তির নয় ফুট বাই নয় ফুট একটি ঘরে ছিল তাদের সংসার।
রাহেলা বলেন, ‘মানুষের চিৎকার শুইনা বাইরে আইসা দেখি আগুন। ততক্ষণে আমাদের ঘরের কাছাকাছি আগুন চলে আসছে। মা’রে নিয়া তাড়াতাড়ি দূরে চলে আসছি। ঘরের ভিতর সবকিছু পুড়ে গেছে। ট্রাংকের ভিতর টাকা ছিল, সব পুড়ে গেছে।’ পুড়ে যাওয়া সর্বস্বের সামনে এক নারীর কান্নারাহেলার মা খাদিজা বেগম বলেন, ‘কয়েকবছর কষ্ট কইরা কিছু টাকা জমাইছিলাম। সেটাও পুইড়া গেল। অহন আর কিচ্ছু নাই। আমরা এখন কই যামু!’ বলেই পুড়ে যাওয়া সংসারের ধ্বংসস্তূপ থেকেও যদি কিছু পাওয়া যায়, সেই আশায় এখানে-ওখানে হাতড়াতে থাকেন খাদিজা বেগম।
ইলিয়াস, খাদিজা, রাহেলার মতো কয়েক লাখ মানুষের বসবাস কড়াইলের এই বস্তিতে। এখানে গত বুধবারের আগুনে সর্বস্ব হারিয়েছেন অন্তত পাঁচ শতাধিক পরিবার। তাদের অধিকাংশই খেটে খাওয়া মানুষ। জমির মূল মালিক বিটিসিএল হলেও দীর্ঘদিন ধরে এই বস্তির দখল বস্তিবাসীদের হাতেই।
এদিকে কড়াইল বস্তির আগুনের ঘটনার তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের ডেপুটি ডিরেক্টরকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহম্মেদ খান বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তারা কাজ শুরু করেছে।’ মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘আগুন লাগার ঘটনায় কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। আমাদের কর্মীরা, বস্তির মানুষ ও এলাকাবাসী সবাই মিলে কাজ করেছে। তদন্ত রিপোর্ট হাতে পাওয়ার আগে আগুন লাগার সঠিক কারণ সম্পর্কে বলা যাবে না।’ তদন্তে আগুন লাগার যে কারণই বেরিয়ে আসুক না কেন, তাতে আর ভাগ্য বদল হবে না সব হারানো বস্তিবাসীদের। সব হারানোর নির্মম বেদনাই কেবল সঙ্গী তাদের।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৪ ডিসেম্বরও কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ১৪টি ইউনিট প্রায় দেড় ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় প্রায় সাড়ে ৪শ’ ঘর পুড়ে যায়। তারও আগে একই বছরের গত ১৪ মার্চ ঢাকার এ বস্তিতে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। সে সময় অর্ধশত ঘর পুড়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *