শেখ হাসিনার ভারত সফরে ভেতরে-বাইরে চ্যালেঞ্জ

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফর নিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন সরকার। এ নিয়ে যেমন দেশের অভ্যন্তরে সমালোচনা রয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকেও রয়েছে কড়া নজর। এছাড়া প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসেবেও রয়েছে গড়মিল। ফলে এই সফর নিয়ে সরকারের ভেতরে-বাইরে এক ধরনের অস্বস্তিও বিরাজ করছে বলে জানা যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাওয়ার আগেই নানা ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধী মহল কঠোর সমালোচনায় সোচ্চার হয়েছে। উতোমধ্যে দেশের বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এই সফরের প্রাপ্তির হিসেব কষতে শুরু করেছেন।
পত্রপত্রিকায় ও টেলিভিশন টকশোতে এখন প্রধান আলোচ্য বিষয় এই সফর। এই সফরের সম্ভাব্য দিকগুলো নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিশেষ করে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা ও তিস্তা চুক্তির বিষয়ে খুবই সোচ্চার বিরোধী জোটের নেতারা। আন্তর্জাতিক মহল বিশেষ করে চীন-যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো অনেক দেশ নজর রাখছে এদিকে। সবমিলেই এই সফরের সফলতা-ব্যর্থতার উপর নির্ভর করছে দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ। এই সফরের ফলাফল যাই হোক বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গন যে কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে উঠতে যাচ্ছে তার আভাস আগে থেকে পাওয়া যাচ্ছে।

ফলে এই সফরকে সরকার পক্ষ থেকেও খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের আগেই দিল্লিতে গিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে দিয়েছেন তার কেবিনেটের সিনিয়র দুই মন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। আর এই সুযোগে দিল্লিও হোমওয়ার্ক শুরু করে দিয়েছে।

জানা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সফরে ৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে তার বৈঠক, ৯ এপ্রিল তিনি আজমীর শরীফ যাবেন এবং ১০ এপ্রিল তিনি দেশে ফিরবেন। গত ১৪ মার্চ সোমবার ঢাকা ও দিল্লীর উভয় দেশ থেকে একযোগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সরকারী ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফর অন্যরকম গুরুত্ব বহন করছে। কেননা, এই সফরকালে সমঝোতা স্মারকসহ ৪১টি চুক্তি সই হবে। এখন এটি মোটামুটি ওপেন সিক্রেট যে, ভারত সফরকালে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে কোন চুক্তি হচ্ছে না। তবে ভারতীয় পত্র-পত্রিকা, বার্তা সংস্থা, বিবিসি ও বাংলাদেশী পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট মোতাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকালে যেসব চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে তার মধ্যে একটি হবে দীর্ঘ মেয়াদী প্রতিরক্ষা চুক্তি। এই চুক্তি নিয়ে ভারত এবং বাংলাদেশের মিডিয়ায় তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে যে, এই প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ সরকার একটি অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে রয়েছে।

কারণ ভারত চাচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ চাচ্ছে একটি সমঝোতা স্মারক। বিভিন্ন সূত্রে যেসব খবর আসছে, সেসব খবর থেকে দেখা যায় যে, ভারতের প্রত্যাশা বাংলাদেশের সাথে একটি দীর্ঘ মেয়াদী চুক্তিস্বাক্ষর। সেই চুক্তির মধ্যে থাকবে ভারত থেকে সমরাস্ত্র কেনা, ভারতীয় বাহিনীর নিকট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং অন্যান্য মিলিটারি টু মিলিটারি সহযোগিতা। এ চুক্তির খসড়ার অগ্রগতি হচ্ছে। ফলে এ বিষয়টি সর্বমহলে বেশ গুরুত্বের

এরই মধ্যে বাংলাদেশের বিরোধী জোটের নেতারা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে ভারতের সঙ্গে যেসব চুক্তির কথা শোনা যাচ্ছে তার প্রতিরক্ষা চুক্তি খুবই স্পর্শকাতর। কেননা, এটা করা হলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিলীন হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে দেশকে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া হবে।

কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘ সাত বছর পর দ্বিপক্ষীয় সফরে নয়াদিল্লি যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৮ বছর ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তি সমাধানের বিষয়ে এখনো পর্যন্ত ইতিবাচক তথ্য দিতে পারেনি প্রতিবেশী দেশটি। তবে তিস্তা চুক্তি হোক বা না হোক প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে দুই দেশের মধ্যকার দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক আরো জোরদার হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন কূটনীতিক বিশ্লেষকরা।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির মতানৈক্য না হওয়ায় বহু কাঙ্খিত এ চুক্তির বিষয়ে এখনো শঙ্কা কাটেনি। তারপরও এই সফরে আশাবাদী বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী ভারত।

প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর প্রসঙ্গে বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ রাজনৈতিক ও সুশীল মহলে রয়েছে নানা শঙ্কা। তারা এই সফরকে বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচক বলে মনে করছেন। আর তাই প্রতিনিয়ত এই সফরকে নিয়ে তারা বিভিন্ন যুক্তি তর্ক উপস্থান করে যাচ্ছেন।

সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কী চুক্তি হতে যাচ্ছে তা প্রকাশ করা ম্যান্ডেটরি।

তিনি বলেন, একটি দেশের সঙ্গে অন্য দেশের চুক্তি হতেই পারে। কিন্তু সেটা জনগণ জানবে না, সেটা হতে পারে না।

তিনি আরো বলেন, এ পর্যন্ত যতগুলো চুক্তি হয়েছে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। শুধু তাই নয়, আমরা দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় আছি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে এবার বোধহয় ভারতের সঙ্গে পানি সমস্যার কিছুটা সুরাহা করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এক ফোটা পানিও তিস্তা নদী পায়নি।

এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, শেখ হাসিনা আপনি যোগ-বিয়োগে ভুল করছেন। যাই করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে বন্ধক দিয়েন না। আপনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে যখন তখন এই জনগণকেই ব্ল্যাকমেইল করতে পারতেন না।

তিনি আরো বলেন, এবার ভারতে গেলে আঁচলটা বেঁধে যাবেন কিন্তু খুলে দিয়ে আসবেন না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিয়ে খেলবেন না।

তবে এ সফর নিয়ে বেশ আশাবাদী ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। তারা এ সফরকে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন। তারা এই সফরকে দেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণভাবেও দেখছেন।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এভরিথিং ইজ ওপেন, নাথিং সিক্রেট।

তিনি বলেন, ভারতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের স্বার্থেই চুক্তি হবে প্রকাশ্যে। বাংলাদেশের স্বার্থে সমঝোতা স্মারক হবে প্রকাশ্যে। নাথিং ইজ সিক্রেট, এভরিথিং উইল বি ওপেন। সবকিছু হবে খোলামেলা, নো সিক্রেসি, নো প্রাইভেসি। বাংলাদেশের স্বার্থে ভারতের সঙ্গে সমঝোতা হবে, চুক্তি হবে। সেটা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে ও জাতীয় স্বার্থে হবে।

তবে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।

ভারতের সঙ্গে সামরিক চুক্তির বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, আজ আমাদের দেশে যেসব অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড ও অপকর্ম পরিচালিত হচ্ছে সবকিছুই ভারতের মদদে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ভারত এখন আমাদের দেশের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে নতুন করে নিরাপত্তা ও সামরিক চুক্তির জন্য সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছে। এটা হলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে, দেশকে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া হবে।

বিএনপির রুহুল কবীর রিজভী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে সামরিক চুক্তি হলে সেটি আত্মঘাতী এবং জাতীয় স্বাধীনতাবিরোধী হবে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা যদি ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয় এবং ভারতের ইচ্ছা অনুযায়ী যদি প্রতিরক্ষা নীতি গ্রহণ করতে হয়, তাহলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বলে কিছু থাকবে না বলে তিনি মনে করেন।

প্রসঙ্গত, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতি থেকে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে অমীমাংসিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়েও সমাধান চায় বাংলাদেশ। পাশাপাশি অন্যতম মেগা প্রকল্প গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণেও সহযোগিতার বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা চায় ঢাকা।

ভারত এগিয়ে রেখেছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সংক্রান্ত সমঝোতা (রূপরেখা চুক্তি) সইয়ের বিষয়ে। এসব বিষয় চূড়ান্ত করতে দফায় দফায় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দু’দেশ।

এদিকে সম্প্রতি তিস্তা নিয়ে বেশ কৌশলী ছিলেন ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা।

পররাষ্ট্র সচিব সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন, আমাদের দেখতে হবে কোনটি সম্ভব আর কোনটি সম্ভব নয়। সামরিক চুক্তির বিষয়টিও স্পষ্টত ‘না’।

তবে কূটনৈতিক সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরে ভারতের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা নিয়ে কোনো চুক্তি হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে, যাতে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে প্রশিক্ষণ, সফর বিনিময়, যৌথ মহড়া, দুর্যোগ মোকাবেলা এবং জঙ্গি দমনে সহায়তার বিষয় থাকবে। তবে এ সমঝোতা স্মারকের মেয়াদকাল কতদিন হবে সে বিষয়ে এখনো কোনো কিছু জানা যায়নি।

জানা গেছে, এ সফরে যুদ্ধ অস্ত্র কেনার জন্য বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলারের একটি ঋণ প্যাকেজ দিতে চায় ভারত। এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যকার লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) দেয়া সংক্রান্ত আরেকটি সমঝোতা স্মারক সই হবে। এদিকে গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়েও আপত্তি তুলেছেন মমতা। তাই এ বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সমীক্ষা চায় ভারত।

প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফর সম্পর্কে একটি ইংরেজি পত্রিকায় মন্তব্য করা হয়েছে যে, এ সফরে তিস্তার পানি বণ্টন সম্পর্কে কোন চুক্তি হচ্ছে না। কিন্তু ভারত কর্তৃক চট্টগ্রাম এবং মংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর দিল্লী সফরকালে কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে কিনা, সে সম্পর্কে ভারত ও বাংলাদেশের কোন সরকারই স্পষ্ট করে কিছু বলছে না। তবে বাংলাদেশে বিরোধীদল বিশেষ করে বিএনপির পক্ষ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে।

চার দিনের সরকারি সফরে আগামী ৭ এপ্রিল ভারতের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার এই সফরে দু’ডজন চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও বিভিন্ন দলিল সই হতে পারে বলে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, সাত বছর পর দ্বি-পাক্ষিক সফরে ভারত যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে ২০১০ সালে দ্বি-পাক্ষিক সফরে ভারত যান তিনি।

অন্যদিকে, ২০১৫ সালের জুনে প্রথম দ্বি-পাক্ষিক সফরে বাংলাদেশে আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *