ঘরে-বাইরে সর্বত্রই নির্যাতিত হচ্ছে নারীরা

আফরোজা খানম: ঘরে-বা্ইরে সর্বত্রই নির্যাতিত হচ্ছে নারীরা। সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীর অগ্রগতি বড় ভূমিকা থাকলেও ঘরে-বাহিরে কোথায়ও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি এতটুকু। বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও বেড়েছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। বেড়েছে যৌন হয়রানি, ধর্ষণসহ, অপহরণের ঘটনা। এগুলোর মধ্যে কিছু ঘটনা প্রকাশিত হলেও বেশির ভাগ ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায় লোকলজ্জার কারণে। এমন অবস্থার মধ্যদিয়েই ৮মার্চ বুধবার পালিত হতে যাচ্ছে আন্তজার্তিক নারী দিবস-২০১৭।

যদিও নির্যাতিতদের আইনি সুবিধার্থে ২০০০ সালে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন তৈরি করে। সে আইনকে ২০১৩ সালে সংশোধন করে আরো কঠোর করা হয়। আইনি প্রতিকার চাইলে সে জন্য কোথায় যেতে হবে, কার কাছে যেতে হবে সে সম্পর্কে কিছু জানে না।

এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপ বলছে, বাংলাদেশের বিবাহিত নারীদের ৮০ শতাংশই নির্যাতনের শিকার। তার মানে ৮০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন।

২০১৬ সালে ১৩ থেকে ২২ আগস্ট সারাদেশের ২১ হাজার ৬৮৮ জন নারীর নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে নির্যাতনের এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। জরিপে বরিশাল বিভাগের ২ হাজার ৩২০, চট্টগ্রাম বিভাগের ৩ হাজার ৪৬৭, ঢাকা বিভাগের ৫ হাজার ২১, খুলনা বিভাগের ২ হাজার ৭৬২, রাজশাহী বিভাগের ৩ হাজার ২৫, রংপুর বিভাগের ২ হাজার ৭৮৫ এবং সিলেট বিভাগের ২ হাজার ৩০৮ জন নারীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপ পরিচালনায় কোনো পুরুষের অংশগ্রহণ ছিল না। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল এ জরিপের অর্থায়ন করে।

জরিপের তথ্যানুযায়ী রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগের নারীরা সবচেয়ে বেশি শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার। আর সবচেয়ে কম নির্যাতনের শিকার হয় সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের নারীরা। রাজশাহী বিভাগের ৬০ শতাংশ বিবাহিত নারী অভিযোগ করেছেন, তারা স্বামীর কাছ থেকে জীবনের কোনো না কোনো সময়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। খুলনা বিভাগের ৫৭ শতাংশ ও রংপুর বিভাগের ৫৫ শতাংশ নারী একই ধরনের কথা বলেছেন।

শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি যৌন নির্যাতনেও এগিয়ে রাজশাহী বিভাগ। দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ নারী বলেছেন, স্বামীর কাছ থেকে জীবনের কোনো না কোনো সময়ে তারা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। রংপুরের ৩৪, খুলনার ৩০, ঢাকার ২৪, চট্টগ্রামের ২৩ ও সিলেটের ২০ শতাংশ নারী একই কথা বলেছেন।

জরিপ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২২ শতাংশ নারী বলেছেন, তারা কর্মক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১১; গাড়ি, সড়ক ও রাস্তায় ১০ শতাংশ নারীকে শারীরিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৭৭ শতাংশ নারী বলেছেন, স্বামীর বাড়িতে তারা বেশি নির্যাতিত হয়েছেন। ১৬ শতাংশ নারী বলেছেন, তারা নিজের বাবার বাড়িতে নির্যাতিত হয়েছেন। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নারীর ক্ষমতায়নে চোখে পড়ার মতো সাফল্য অর্জিত হলেও পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে নারী নির্যাতন এখনো ভয়াবহ পর্যায়ে রয়ে গেছে। ২০১১ সালের জরিপে নারী নির্যাতনের হার ছিল ৮৭ শতাংশ।

পাঁচ বছরে তা ৮০ শতাংশে নেমে এলেও এ হার নিঃসন্দেহে আশঙ্কাজনক; যা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার।

পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে আগে নারীরা মুখ খুলতেন না। ঘরোয়া ব্যাপার বা লজ্জাজনক মনে করতেন। বর্তমানে মুখ খুলছেন।

অন্যদিকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহুদিন আগে থেকেই কাজ হচ্ছে। কিন্তু নারী নির্যাতনের মাত্রা বাড়ছেই। এর মূল কারণ হলো, নারী নির্যাতনের বিষয়টি এখনো জাতীয় বিষয়ে পরিণত হতে পারেনি। চোখের সামনে নির্যাতন দেখলেও সবাই মেনে নিচ্ছে। দুর্বল আইনের শাসনও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। তাই এ ধরনের সংস্কৃতি যত দিন পরিবর্তন না হবে, তত দিন নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

তারপরও এসব ঘটনায় নির্যাতিতদের আইনি সুবিধার্থে ২০০০ সালে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন তৈরি করে। সে আইনকে ২০১৩ সালে সংশোধন করে আরো কঠোর করা হয়। আইনি প্রতিকার চাইলে সে জন্য কোথায় যেতে হবে, কার কাছে যেতে হবে সে সম্পর্কে কিছু জানে না।

তাই কীভাবে আইনি সুবিধা পাবেন তা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-
যেসব অপরাধ নারী ও শিশু নির্যাতনের অন্তর্ভুক্ত
বাংলাদেশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ সংশোধিত ২০১৩ অনুযায়ী যেসব অপরাধ এ আইনের অন্তর্ভুক্ত তা হলো- দহনকারী বা ক্ষয়কারী, নারী পাচার, শিশু পাচার, নারী ও শিশু অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ধর্ষণ, ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যু, নারীর আত্মহত্যায় প্ররোচনা, যৌন নিপীড়ন, যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানো, ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদির উদ্দেশ্যে শিশুকে অঙ্গহানি, ধর্ষণের ফলে জন্মলাভকারী শিশু সংক্রান্ত বিধান।

থানায় মামলা দায়ের
উল্লিখিত যে কোনো ঘটনার শিকার হলে আপনার পার্শ্ববর্তী থানায় গিয়ে বিষয়টি জানান। বিষয়টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এজাহার হিসেবে গণ্য করলে তিনি ঘটনাটি প্রাথমিক তথ্য বিবরণী ফরমে লিপিবদ্ধ করবেন। পরে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন হাকিম আদালতে প্রেরণ করবেন। এখতিয়ারাধীন হাকিম তা গ্রহণ করলে ওই মামলার আসামিদের আদালতের সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য একটি তারিখ ধার্য করবেন। এবং পরবর্তী সময়ে মামলাটি বিচারের জন্য উপযুক্ত আদালত তথা নারী ও শিশু নির্যাতন অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠাবেন। এরপর নারী ও শিশু নির্যাতন অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল মামলাটি বিচারের জন্য সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য করলে সেই তারিখে মামলাটির বাদী ও অভিযুক্তকে আদালতের সামনে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দিতে হবে এবং মামলার পরবর্তী কার্যক্রম চলতে থাকবে।

আদালতে মামলা
কোনো কারণে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) যদি অভিযোগটি গ্রহণে অসম্মতি প্রকাশ করেন, তাহলে থানায় কারণ উল্লেখ করে মামলাটি গ্রহণ করা হয়নি মর্মে আবেদনপত্র সঙ্গে নিয়ে সরাসরি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করা যাবে।
এ ক্ষেত্রে মামলাকারী ব্যক্তি প্রথমে নারী ও শিশু নির্যাতন অপরাধ দমনে নিযুক্ত নারী ও শিশু পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি নারী ও শিশু) কাছে প্রত্যয়ন ও সত্যায়িত করে মামলা করতে হবে। এ ছাড়া আবেদনটি বিচারকের সামনে হাজির করার সময় অভিযুক্তকে আদালতে উপস্থিত হয়ে জবানবন্দী দিয়ে মামলা করতে হবে। আদালত অভিযুক্তের জবানবন্দি শোনার পর মামলাটি আমলে নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন।

সরকারি আইনজীবী
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় বাদী নিজস্ব কোনো আইনজীবী নিয়োগের প্রয়োজন নেই। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯২ ধারা অনুযায়ী তিনি সরকারের পক্ষ থেকে আইনজীবী পাবেন। তিনি মামলার সব তত্ত্বাবধান করবেন। যদি বাদী নিজে আইনজীবী নিয়োগ দিতে চান তাহলে সেই আইনজীবী সরকারি আইনজীবীর অধীনে কাজ করবেন। সরকারের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়া আইনজীবীকে কোনো খরচ দিতে হবে না।

বিচার প্রক্রিয়া
দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। এই আইনে ট্রাইব্যুনাল রুদ্ধদ্বার কক্ষে বিচার পরিচালনাও করতে পারেন। কোনো ব্যক্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বা স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত মনে করলে বিচারক শুধু মামলার দুই পক্ষকে এবং তাদের নিয়োজিত আইনজীবীদের নিয়ে বিচার পরিচালনা করতে পারেন। তা না করলে বিধান মোতাবেক বিচার পরিচালিত হবে।

বিচারের মেয়াদ
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধিত আইন ২০১৩ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করবেন। ট্রাইব্যুনাল যদি ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার কারণসংবলিত একটি প্রতিবেদন ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করবেন। যার একটি অনুলিপি সরকারকেও দিতে হবে। তা ছাড়া এ ক্ষেত্রে পাবলিক প্রসিকিউটর ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে কারণ উল্লখপূর্বক প্রতিবেদন দাখিল করবেন। এ রকম দাখিলকৃত প্রতিবেদনগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিবেচিত হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই আইন অনুযায়ী পুলিশ যদি অভিযোগ গ্রহণ না করে সে ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল সরাসরি বিচারের জন্য অভিযোগ নিতে পারেন। এই বিধানটি যদি বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়, তবে জনগণের অভিযোগ করা অনেক সহজ হবে।

নিরাপত্তামূলক হেফাজত
এই আইনের অধীন বিচার চলাকালে যদি ট্রাইব্যুনাল মনে করেন কোনো নারী বা শিশুকে নিরাপত্তামূলক হেফাজতে রাখা প্রয়োজন, তাহলে ট্রাইব্যুনাল ওই নারী বা শিশুকে কারাগারের বাইরেও সরকার কর্তৃক নির্ধারিত স্থানে বা যথাযথ অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিতে পারেন। বিচার চলাকালে যদি অপরাধী মহল নির্যাতিত নারী বা শিশুকে আবার কোনো ধরনের আঘাত করে বা করতে চায়, তা থেকে রক্ষার জন্য এই বিধান। তা ছাড়া অভিযুক্তকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্যও হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিতে পারে ট্রাইব্যুনাল। তবে কোনো নারী বা শিশুকে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখার আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল ওই নারী বা শিশুর মতামত গ্রহণ ও বিবেচনা করবেন।

তদন্ত
অভিযুক্ত ব্যক্তি হাতেনাতে পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তদন্ত শেষ করবে। আর অপরাধী ধরা না পড়লে তদন্তের নির্দেশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত সমাপ্ত না হলে তার কারণ ব্যাখ্যা করে সময় শেষ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ট্রাইব্যুনালকে জানাতে হবে। ট্রাইব্যুনাল ইচ্ছে করলে অন্য কর্মকর্তার ওপর তদন্তভার অর্পণের আদেশ দিতে পারেন। এই আদেশ দেওয়ার সাত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে।

আগাম জামিনের পথ বন্ধ
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনটি একটি বিশেষ আইন। এ মামলায় হাইকোর্টকে আগাম জামিন দেওয়ার এখতিয়ার দেওয়া হয়নি। বিশেষ আইনে জামিনের ক্ষেত্রে সাধারণত ফৌজদারি কার্যবিধির বিধানগুলো প্রযোজ্য হবে না। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১৯(২)(৩) ও (৪) উপধারায় জামিনের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির কোনো বিধান ১৯ ধারায় প্রযোজ্য হয়নি। যদিও সামাজিক বাস্তবতার বিষয় চিন্তা করে কয়েক বছর ধরে হাইকোর্ট এ ধরনের মামলায় আগাম জামিন দিচ্ছেন।

শাস্তি
বাংলাদেশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ সংশোধিত ২০১৩ অনুযায়ী এসব অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। এ ছাড়া রয়েছে অর্থদণ্ডের বিধান।

প্রতিকারের জন্য যারা সহযোগিতা করবে
আপনি যদি মামলা করতে অসমর্থ হন বা কোনো হুমকির সম্মুখীন হন, তাহলে কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন রয়েছে যারা আপনাকে সহযোগিতা করবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা, বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড (ব্লাস্ট), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল প্রভৃতি।

[লেখক: সাংবাদিক ও উন্নয়ন কর্মী।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *