‘গঙ্গা ব্যারেজ ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে বাঁচানো অসম্ভব’

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা : গঙ্গা ব্যারেজ ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে বাঁচানো অসম্ভব-‘নদী বাঁচাও-দেশ বাঁচাও-মানুষ বাঁচাও’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় একমঞ্চ দাঁড়িয়ে বিষয়টি স্বীকার করলেন- পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, নৌ পরিবহণ মন্ত্রী শাজাহান খান ও পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বীরপ্রতীক।বিশ্ব পানি দিবস উদযাপন এবং এশিয়ান টিভিসহ অন্যান্য প্রচার মাধ্যমে গত ৩ বছর ধরে নদী ভিত্তিক শতাধিক তথ্যচিত্র ও সংলাপ প্রচারে সাফল্যে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন, ‘উন্নয়নের পথে’, ‘সময়ের সংলাপ’ এবং ‘উন্নয়ন সংলাপ’ অনুষ্ঠানগুলোর উপস্থাপক ও দৈনিক জনতা’র উপদেষ্ঠা সম্পাদক মো. শাহাবুদ্দিন শিকদার। এরপর তার উপস্থাপনায় দেশের নদ-নদীগুলোর উপর আধা ঘণ্টাব্যাপী প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এই প্রামাণ্যচিত্রে তুলে ধরা হয় নদীভাঙ্গন, নদী নিয়ে সরকারের নানামুখি পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা ছাড়াও দেশের নদ-নদীগুলো বর্তমান চিত্র।
দৈনিক জনতার উপদেষ্টা সম্পাদক ও এশিয়ান টিভির উন্নয়নের পথে, সময়ের সংলাপ এবং উন্নয়ন সংলাপ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মো. শাহাবুদ্দিন শিকদার বলেন, গত ৩ বছর আগে সারা দেশের পানি সেক্টরে তথ্যচিত্র নির্মাণ করে এশিয়ান টিভির মাধ্যমে প্রচার শুরু করি। সম্প্রতি তা ১০০ পর্ব অতিক্রম করেছে। এই তথ্যচিত্র নির্মাণের সময় আমি দেশের ১২০০ নদীকে খুঁজেছি। কিন্তু নদীর বুকে দেখেছি স্থাপনা, ট্রাক আর বাস। নদীগুলো কোথাও কোথাও এমনভাবে দখল, দুষিত হয়েছে যে দেখে মনে হয়না এখানে আদৌ নদী ছিলো। বিশেষ করে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো আজ নি:শ্বেস প্রায়। তবে তারপরও আশা করি, কোন একদিন বুড়িগঙ্গা হয়ে উঠবে অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। কারণ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ’র কার্যক্রমে আমি আশান্বিত, আশা করি বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো তার আগের চেহারায় ফিরে আসবে।
প্রামান্যচিত্রের একপর্যায়ে উপস্থাপক প্রশ্ন রাখেন, গঙ্গা ব্যারেজ নিয়ে কেন ভারতের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে? ভারত তো ফারাক্কা ব্যারেজ নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেনি? তবে কেন আমরা করতে যাবে?
যার জবাবে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, এটা সত্য গঙ্গা ব্যারেজ ছাড়া বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে বাঁচানো অসম্ভব। ভারতের উজান থেকে আমরা আগে ৫৫ হাজার কিউসেক পানি পেতাম কিন্তু বর্তমানে ২০ হাজার কিউসেকও পাওয়া যায় না। যার ফলে দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। এই অঞ্চলকে বাঁচাতে হলে আরও ২০ হাজার কিউসেক পানি গঙ্গা, মাথা ভাঙ্গা, চন্দনা নদীতে ধরে রাখতে হবে। আর এই জন্য গঙ্গা ব্যারেজের বিকল্প নেই উল্লেখ করে পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, গঙ্গা ব্যারেজ নিয়ে ভারতের সাথে আলোচনা করতে হবে জায়গা অধিগ্রহণের জন্য। এই নদীটি ১৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে ৮২ কিলোমিটার উভয়পাশে বাংলাদেশ। তারপরও ভারতের কাজ থেকে কিছুজমি অধিগ্রহণ করতে আলোচনা করতে হবে। অন্যদিকে ব্যারেজের এক চতুর্থাংশ পানি জমা হবে ভারতের জায়গায়। এ নিয়ে সমঝোতার জন্য তাদের সাথে আলোচনা চলছে। আশা করছি, অচিরেই একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান আসতে পারবো।
আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন,, নদী মরে যাচ্ছে। নদী মরে গেলে দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। সবাই এটা উপলব্ধি করছে। আর তাই সচেতনতা বাড়াতে হবে। ছোট নদীগুলোকে পলিমুক্ত করতে ড্রেজিং ছাড়া কোন উপায় নেই। এজন্য ‘ওয়েল ব্যালান্সড’ প্রোগ্রাম করতে হবে। বড় নদীগুলোকে নিয়ে ইতোমধ্যেই মাস্টার প্ল্যান করা হয়েছে। ড্রেজিং সহজ কিন্তু এর ‘ম্যাটরিয়েল্স’ নিয়ে আমরা কি করবো সেটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হচ্ছে।

বুড়িগঙ্গা নদী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্জ্য ফেলা বন্ধ না করা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গাকে দুষণমুক্ত করা যাবেনা। নদীর ম্যানেজমেন্ট যতক্ষণ পর্যন্ত সঠিকভাবে না করা যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত সমস্যা সমাধান হবে না।

তিনি বলেন, পানি সংরক্ষণের জন্য বন্দোবস্ত করতে হবে। নদীর দখল, দুষণ, বর্জ্য দুষণ বন্ধ করতে হবে। সর্বোপরি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

অনুষ্ঠনের উদ্বোধক ও প্রধান আলোচক নৌ পরিবহণ মন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, এখন নদী আর্তনাদ করছে। বলছে বাঁচাও। অন্যথায় মানুষ বাঁচানো যাবে না। নদী দূষিত হচ্ছে। দখলের ফলে নদীর নাব্যতা হারিয়ে যাচ্ছে। এর জন্য মানুষের অসচেতনতা দায়ী। তাই নদী দখল রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

তিনি বলেন, অতীতের কোনো সরকার নদী সংরক্ষণের জন্য কাজ করেনি। বঙ্গবন্ধুর কেনা ৭টি ড্রেজার দিয়ে আমরা ড্রেজিং শুরু করি। ২০০৯-১৩ সালে আমরা ১৪টি ড্রেজার সংগ্রহ করেছি। বেসরকারি খাতেও ৭০টি ড্রেজার সংগ্রহ করে নদী খননের বিপ্লব ঘটিয়েছি। এছাড়াও আরও ১০টি ড্রেজারের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথের ২০ হাজার কিলোমিটারই আজ হারিয়ে গেছে। পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে দরকার ২ শতাধিক ড্রেজার, যা আমাদের নেই। যে কারণে এখনও আমরা পুরোপুরি সফল হইনি।

প্রিমিয়ার নিউজ সিন্ডিকেট লিমিটেড’র উদ্যোগে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি বক্তব্য রাখেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বীর প্রতীক, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান, দৈনিক জনতা’র সম্পাদক আহসান উল্লাহ, বিআইডব্লিউটিএ’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ভোলা নাথ দে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক মো. সহিদুর রহমান, পাউবো’র পূর্বাঞ্চলের এডিজি প্রকৌশলী একে এম মমতাজ উদ্দিন, পাউবো’র পশ্চিমাঞ্চলের এডিজি মাহফুজুর রহমান, বিআইডব্লিউটিএ’র অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রকিবুল ইসলাম তালুকদার, ঢাকা সারর্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল মতিন, সাত্তার মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান এম সাত্তার খান প্রমুখ।

নদী বাঁচলে, বাংলাদেশ বাঁচবে। আর নদীগুলোকে বাঁচাতে না পারলে বাধাগ্রস্থ হবে উন্নয়ন ও অগ্রগতি। বিপন্ন হবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব। ভেঙ্গে পড়বে গোটা দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নদী কেন্দ্রীক অর্থনীতি। দখল, দূষণ আর নাব্যতা হারিয়ে ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথের ২০ হাজার কিলোমিটারই আজ হারিয়ে গেছে। যা দেশ ও দেশের মানুষের জন্য আতংকজনক বলে স্বীকার করলেন সবাই।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি বক্তব্যে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বীর প্রতীক বলেন, ২৪টি বড়, মাঝারী নদীকে ‘আইডেন্টিফাই’ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পরিকল্পনাও হাতে নেয়া হয়েছে। তবে সেটা বিশাল অংকের ব্যাপার। এ কারণে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগবে। তবে যত অর্থই লাগুক বড় বড় নদীগুলোকে পুনরুদ্ধার করা হবে। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন বড় বড় নদীর পাশাপাশি ছোট ছোট নদী-খাল ও বিল-জলাধারগুলোকেও উদ্ধার করতে হবে। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়নের অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটছে। অথচ এই নদী বাঁচানো না গেলে বাধাগ্রস্ত হবে সকল প্রকার উন্নয়ন। তিনি বলেন, নদীকে বাঁচাতে না পারলে ভেঙ্গে পড়বে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও।

নদী দখল ও দুষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার এখনই সময় উল্লেখ করে দৈনিক জনতা’র সম্পাদক আহসান উল্লাহ বলেন, নদী মরে গেলে দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। নদী ভিক্তিক প্রামাণ্যচিত্র দেখে সবাই এটা উপলব্ধি করছে। আর তাই সচেতনতা বাড়াতে হবে। জনগণকে সাথে নিয়েই দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

হাফেজ মো. সোলাইমানের পবিত্র কোরান তেলায়াত ও কেককাটার মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হলেও এর আগে নদী নিয়ে সঙ্গীত পরিবেশন করেন, মরমী শিল্পী আব্দুল আলিমের কণ্যা কণ্ঠশিল্পী নাজু আলিম ও লুইপা।

অনুষ্ঠানের পক্ষ থেকে মংলা-ঘোষিয়াখালী চ্যানেল পুনরুদ্ধারে অসাধারণ অবদান রাখায় নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএকে স্মারক সম্মাননা ও সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডকেও যৌথভাবে স্মারক সম্মাননা প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানের শেষেও জনপ্রিয় উস্থাপিকা কথার উপস্থাপনায় মনোঙ্গ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশনেন কণ্ঠশিল্পী দিঠি আনোয়ার ও বাংলাদেশ আইডল মন্টি। অনুষ্ঠানটি মিডিয়া পার্টনার ছিলো দৈনিক জনতা। আর পুরো সরাসরি সম্প্রচার করে এশিয়ান টিভি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *