ধর্মের নামে অপকর্ম জায়েজের চেষ্টা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: আসছে জুলাই মাসে গুলাশানের হলি আর্টিজানে ভয়াল জঙ্গি হামলার এক বছর হবে। সেই হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেমন তার সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে, তেমনি সাধারণভাবে জঙ্গি বিরোধী একটা জাতীয় ঐক্যও আমরা অনুভব করছিলাম। গত নয়টি মাস দেশের মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাফল্যে যেমন আশার আলো দেখেছে, তেমনি জঙ্গিবাদকে কেন্দ্র করে কুৎসিত রাজনীতি দেখেও হতাশ হচ্ছে।
হলি আর্টিজানে হামলার পর যে ভঙ্গুর একতা গড়ে উঠেছিল, তা ভাঙতে খুব একটা সময় লাগেনি। আবারও দেখা গেল, প্রতিক্রয়াশীলরা তাদের জঙ্গি তৎপরতার সুরক্ষা দেয়ার জন্য পুলিশ, সামরিক কমকর্তা এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যু দেখেও, জঙ্গিবাদের উত্থানকে ‘নাটক’ আখ্যায়িত করে নাটকীয় সমর্থন দিচ্ছে।
যদিও সিলেটের আতিয়া মসজিদে সেনাবাহিনী অপারেশন পরিচালিত করায় বিএনপি চেয়ারপারসন একটি বিবৃতি দিয়ে জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে বলে স্বীকার করেছেন, কিন্তু সামগ্রিকভাবে দল প্রতিদিন যে মিডিয়া ব্রিফিং করে তাতে জঙ্গিবাদের প্রতি প্রায় প্রত্যক্ষ দরদ পরিলক্ষিত।
আর যে ইসলামী দলগুলো, বাংলাদেশতো বটেই, পৃথিবীর কোথাও পান থেকে চুন খসলে ‘ইসলাম গেল’ বলে হুংকার দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে তারা্ মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে ধর্মের নামে ধর্মের সবচেয়ে ক্ষতিকর এসব সভ্যতা বিরোধী শক্তির কর্মকাণ্ড দেখেও।
একের পর এক জেলা, নানা প্রান্তের জঙ্গিদের পদচারণায় প্রকম্পিত হলেও, সরকারের প্রতিরোধের মাঝে তারা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায়। দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাখার বিরুদ্ধে এরা সবাই একাট্টা। বাংলাদেশের পুরো রাজনীতিই মনে হচ্ছে এখন ধর্মীয় মতাদর্শ উদ্বুদ্ধ। সব ধরণের অপকর্মই জায়েজের চেষ্টা হয় ধর্মকে ব্যবহার করে।
ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীদের মগজ ধোলাই করা হয়েছে, তাদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, জিহাদের কল্পনা ও ইসলামি মৌলবাদী দর্শনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে তরুণেরা এমন ভয়ংকর পথে পা বাড়াচ্ছে। বিশ্বব্যাপী বিস্তার এক কারণতো আছেই, কিন্তু সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে ধর্ম ব্যবসায়ীদের ছড়ানো ঘৃণার সংস্কৃতি।
সিরিয়া, ইরাক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ বাংলাদেশে তার ছায়া বিস্তার করেছে। পরিস্থিতি এখন এমন যে, ফরিদ উদ্দিন মাসুদের মতো ইসলামের পণ্ডিত ও আলোকিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরাও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলায় মৌলবাদীদের রোষানলে আছেন।
আমাদের বাহিনীগুলো প্রশ্নাতীতভাবে তাদের সাফ্যল্য দেখিয়ে চলেছেন। আশা করছি, আগামীতেও তাদের সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু জঙ্গিবাদের ঝাপটা ও সহিংস চরমপন্থা প্রকৃত অর্থে দূর করতে হলে তাদের আদর্শিক মূল উপড়ে ফেলর কাজটাই করতে হবে।
কিন্তু এ বড় কঠিন কাজ। যে দেশের সাধারণ রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য, কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মৌলবাদি শক্তির সাথে সখ্য গড়ে, জঙ্গি খুন খারাপিকে বিপ্লব মনে করে, সেদেশে এটা নিশ্চিতভাবেই কোনো সহজ কাজ নয়। প্রথম যে কাজটি করা দরকার তা হলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন মৌলবাদি হয়ে না যায় সেদিকে নজর দেয়া। কিন্তু অন্ধকারের শক্তির কাছে নতজানু হয়ে সে কাজটিই করা হলো বাংলাদেশে। পাঠ্যপুস্তককে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাম্প্রদায়িক চাদর জড়িয়ে দেয়া হলো।
সাম্প্রতিককালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ধনি মানুষের সন্তানদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে যাওয়ার কিছু নজির দেখে অনেকেই বলছেন, মাদ্রাসাগুলোই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ ছড়ানোর একমাত্র উৎস নয়। হ্যাঁ তা নয়, কিন্তু এগুলো নিঃসন্দেহে অন্যতম প্রধান উৎস। আর সংখ্যা হিসাব করলেতো ভিমড়ি খেতে হবে। কারণ দেশজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে এবং উঠছে অনিবন্ধিত ও অনিয়ন্ত্রিত মাদ্রাসা।
বাংলাদেশে জিহাদি সংগঠনের বিস্তারে পৃষ্ঠপোষকতায় বড় ভূমিকা রেখেছে রাজনীতি, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। এর পেছনে আবার আছে বিদেশি অর্থ। সৌদি আরবের পৃষ্ঠপোষকতায় পেট্রোডলারের মাধ্যমে সালাফি মতাদর্শ বিস্তারের জন্য পাকিস্তানি সাহায্যে ধর্মীয় চরমপন্থাকে লালন করা হয়েছে পরম যত্নে। এরই সরাসরি ফল আজকের জঙ্গিবাদ যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তা এক গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধর্মীয় উগ্রবাদকে রাজনৈতিক কারণে সব সরকারই দেখেও না দেখার ভান করেছে। বরং কোন কোন সরকার সরাসরি এদের পদ পদবী দিয়ে উৎসাহিত করেছে। বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পুরনো হলেও যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর থেকে দেখতে পাচ্ছি পাকিস্তানি কায়দায় ধর্মীয় উপদলীয় কোন্দল তৈরীর চেষ্টা হচ্ছে যা আরো ভয়ঙ্কর করে তুলছে পরিস্থিতিকে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটাই এখন প্রধান হুমকি।
মাদ্রাসায় শিক্ষাদান হয় পশ্চাৎমুখী কায়দায়, ছাত্রদের ধর্মশিক্ষা দেয়া হয় খুবই কট্টর ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আবহে। ফলে ছাত্রদের দৃষ্টিভঙ্গিও হয় পশ্চাৎমুখী। এবার নতুন করে স্কুল পাঠ্য ব্যবস্থাকেও সে ধরণের করা শুরু হলো। এমন সিলেবাসে বেড়ে উঠা শিক্ষার্থীরা পরবর্তী জীবনে শুধু একটি কাজই করবে – বিশ্বাসীদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে দিকনির্দেশনা দেয়া, যার জন্য কোনো বিশেষ জ্ঞানের দরকার হয় না।
আধুনিক শিক্ষালাভের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, সৃজনশীলতার টুঁটি চেপে ধরে, অন্ধত্বের পথে হেঁটে জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করা যায় না। সমাজে বিরাজমান চরমপন্থা ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে আমরা যদি আন্তরিক হতে চাই, তাহলে রাজনীতিতে, শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি।
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি।
ishtiaquereza@gmail. com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *