আমি প্রস্তুত, আপনি?

লীনা পারভীন: আমি একজন সচেতন বাংলাদেশী নাগরিক যার হৃদয়ে আছে কেবলি লাল সবুজ। মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি কিন্তু মনে প্রাণে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা কারণ এই মুহূর্তে যদি একটি মুক্তিযুদ্ধ হয় তাহলে যে কোন ব্যক্তিস্বার্থকে ত্যাগ করে আমি সেই যুদ্ধে সামিল হবো একদম সামনের কাতারে।

সেই বিচারে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমি আমার পূর্বসূরিদের আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশকে ধারণ করি। যে চেতনা আর স্বপ্ন নিয়ে তারা যুদ্ধে নেমেছিলো সে স্বপ্নকে টেনে নিয়ে যাওয়াটাও আমার কর্তব্য বলে স্বীকার করি। তাই আমি স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি আমার দেশ ও মাটি নিয়ে।
আজ আমার সেই স্বপ্নের মাঝে কোথায় যেন হাল্কা কুয়াশা এসে জমতে শুরু করেছে। আমি স্বপ্ন দেখি আমার সাধের দেশ হবে অবারিত সবুজের মাঠ যেখানে থাকবে নির্মল বাতাসের ঢেউ। আমি স্বপ্ন দেখি আমার দেশ হবে মাথা উঁচু করা নাগরিকদের দেশ। সেই দেশ যেখানে মানুষের পরিচয় হবে কেবল মানুষ, নারী বা পুরুষ নয়, হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান বা মুসলিম নয়। পাহাড়ী বা বাঙ্গালী বলে বৈষম্য নয়। রাজনীতির শপথ হবে কেবল দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
সংবিধানে লেখা থাকবে মানুষের অধিকারের কথা। দেশের কোন জাত হয় না, ধর্ম হয় না, লিঙ্গ হয় না, সংখ্যালঘু বা গুরু হয়না। সংবিধান হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে দেশ চালনার পথপ্রদর্শক। দেশের নেতৃত্বে যারা থাকবেন, তারা কেবলই চিন্তা করবেন কেমন করে দেশকে সামনে নিয়ে যাওয়া যায়। নতুন উদ্ভাবনী নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। দেশে হবে নতুন নতুন গবেষণা, হবে নতুন নতুন প্রযুক্তির আবিষ্কার। বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হবে বিস্ময়ের সঙ্গে।
আমি হতাশ নই কিন্তু আশার আলোর রেখা যেন ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। মানুষ বাঁচে স্বপ্নে। সেই স্বপ্নের সীমা কেউ কেটে দিলে ধীরেধীরে আমরা মৃত নাগরিক হয়ে যাই।
দেশ স্বাধীন হবার পর প্রথম ধাক্কা আসে ১৯৭৫ এ জাতির পিতা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিকে হত্যার মাধ্যমে। স্বপ্নের দুয়ারে কাঁটা বিছানোর পথ যেন প্রশস্ত হতে থাকলো। যে সময়টাতে দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি বা সংস্কৃতির বিনির্মানের কাজ চলার কথা ঠিক সেই সময়টাকেই বেছে নিলো পুরনো ঘাতকেরা। থেমে গেলো সামনে চলার গতি।
৭৫ পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে ঘটেছে শত্রুদের আসা যাওয়া। স্বাধীনতা বিরুদ্ধ শক্তির ক্ষমতা গ্রহণ কখনো আশ্রয়ে বা প্রশ্রয়ে। কাদামাটির ভিটায় তখন শক্ত সিমেন্টের গাঁথুনি চালিয়েছে তারা। অসাম্প্রদায়িক সংবিধানের গায়ে সাম্প্রদায়িকতার ইটের গাঁথুনি দিয়েছে।
শিক্ষা সংস্কৃতি সব জায়গায় চালিয়েছে সাম্প্রিদায়িক সংস্কৃতির বীজ বপনের কাজ। সে সময় ছিল না কোন প্রতিবাদ। দেশপ্রেমিক জনতা তখন কোণঠাসা। জায়গায় জায়গায় নিজেদের লোকদের প্রতিষ্ঠিত করার কাজটা খুব ভালো করেই করেছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় না থাকলেও যেন ক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায় সেটাই ছিলো লক্ষ্য।
আমাদের দেশের প্রগতিশীল বাম রাজনৈতিক ধারা সবসময় ছিলো একপ্রকার বিভ্রান্তির মধ্যে। বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের টার্গেটে তারা বাস্তবতার নিরিখে দেশীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে গিয়ে ছিলো দ্বিধাবিভক্ত। মুক্তিযুদ্ধকে সংজ্ঞায়িত করতেই কেটেছে অনেক বছর। শত্রুমিত্র নির্ধারণ নিয়ে ছিলো বিভক্তি। জাতীয়তাবাদী রাজনীতি না আন্তর্জাতিকতাবাদ এ নিয়ে ছিলো তর্ক। বিপ্লব কখনো কপি পেস্ট হয় না এর কাস্টমাইজেশন দরকার হয় সেটা বুঝতেও ছিলো ভুল।
তাই যতটা তারা ভূমিকা রাখতে পারতো ততটা পারেনি কখনই। দেশের একটা বড় জনগোষ্ঠী তাদের কাছে চেয়েছিলো একটা কার্যকর নেতৃত্বশীল ভূমিকা। সে জায়গাটাতে বরাবরই হতাশার ছায়া। কমিউনিষ্ট পার্টি, জাসদ থেকে বাসদ, বাসদ থেকে আরেক বাসদ সে থেকে আবার বিভক্তি কেবল তাদের বিচরণ ক্ষেত্রকে সংকীর্ণ করেছে, প্রত্যাশার প্রসার দেয়নি কখনো। যুব সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সফল হলেও ধারাবাহিকতা রেখে এগিয়ে যেতে পারেনি।
পুঁজিবাদী অর্থনীতি কখনই উন্নত সংস্কৃতির জায়গাটিকে প্রাধান্য দেয় না। এই জায়গাটিতে বিরাট ভূমিকা রাখার ছিলো প্রগতিশীল দলগুলোর। হতাশার ছাঁয়া সেখানেও। যদিও তারা স্বীকার করতে রাজি নয়। জাসদ সশস্ত্র বিপ্লবের পথে গিয়ে জিয়ার মতো দেশবিরোধীকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে আসার পথ প্রতিষ্ঠিত করেছে বলেও সমাজে ধারণা আছে। পরবর্তীতে জামাত ইস্যুতে যদিও বামধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ছিলো দৃষ্টান্তমূলক।
১৯৯২ এ জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণআদালতভিত্তিক আন্দোলনে তাঁদের ভূমিকা কেউ চাইলেও অস্বীকার করতে পারবে না। তবে সাম্প্রতিক কালে গণজাগরণ মঞ্চের গণজোয়ারকে তাদের অনেকেই অনুধাবন করে কাজে লাগাতে ভুল করেছে। কেবলমাত্র আওয়ামী লীগকে বিরোধীতা করতে গিয়ে অনেক বামদল ছিলো বিভ্রান্তিতে। অথচ এই গণজোয়ারকে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটা বিশাল সুযোগ ছিলো বামদলগুলোর। পারেনি তারা। এর কতটা আদর্শিক আর কতটা ইগোকেন্দ্রিক সেটা ইতিহাস বিশ্লেষণ করবে।
আজকের জঙ্গীবাদ কিন্তু উপরের সবগুলোর ফসল। বাংলাদেশকে ধারণ করে গড়ে উঠা রাজনৈতিক দলগুলোর বিভক্তি, দেশপ্রেমের অভাব, দেশের স্বার্থে এক হতে পারার ব্যর্থতাই মৌলবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছে।
সরকার তার ক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদী করার লক্ষ্যে ক্রমশ বিরুদ্ধ মতকে কোণঠাসা করার কাজটি করেছে। আর বিরোধীদলে থাকা দলগুলো সরকারের সেই এজেন্ডাকে সাহায্য করেছে নিজেদের একের পর এক ভুলের মাধ্যমে। আমাদের দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি হচ্ছে প্রধান দুটি দল যাদের মধ্যে ক্ষমতার রদবদল হয়।
সামরিক বাহিনী থেকে উঠে আসা দল হলেও বিএনপি এদেশের একটি বৃহত্তর অংশের কাছে তাদের আদর্শকে নিয়ে যেতে পেরেছিলো। কিন্তু ক্রমশ জিয়ার আদর্শে লড়াই করা দলটি তাদের পুরনো মিত্র স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে করে নিলো ঘরের লোক। জামাতের পেটে বসে বসে নামে বিএনপি হলেও কাজে চললো সব জামাতী এজেন্ডার বাস্তবায়ন।
দেশকে পিছিয়ে নিতে তাদের চেষ্টা ছিলো দৃষ্টান্তমূলক। সরকার সেই সুযোগ নিয়ে বিরোধীদলবিহীন ক্ষমতা চালাতে থাকলো। কার্যকর বিরোধীতা ছাড়া গণতন্ত্র থাকে না। সমালোচনা ছাড়া সরকার সঠিকপথে চলে না। কিন্তু জামাতী বা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কোন দলকে দেশবাসী রাজনীতিতে দেখতে চায় না। স্বপ্নের মাঝে কুয়াশা এখানেও।
সরকার তার উন্নয়নকর্মসূচী নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটছে কিন্তু একটি উন্নত দেশের জন্য দরকার সুষম উন্নয়ন। বিষয়টা অনেকটা সুসম খাবারের মতো। এর মধ্যে আছে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার নিশ্চয়তা, উন্নত সংস্কৃতিভিত্তিক সমাজ ও সামাজিক কাঠামো, তরুণ সমাজের জন্য একটি উন্নত জীবনবোধ গড়ে তোলার সুযোগ, একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং একটি শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি। বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক দিক নিয়ে যতটা কার্যকর এবং সফল ততটা অন্য জায়গায় নয়। অর্থনৈতিক মুক্তি টিকিয়ে রাখার সহায়ক ভিত্তি না থাকলে সেটা হয় সাময়িক।
সরকার মুক্তিযুদ্ধকে ভিত্তি ধরলেও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভিতরে ভিতরে আপস করে যাচ্ছে মৌলবাদের সাথে। যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করলেও তাদের গেঁথে যাওয়া বীজ উৎপাটনে ঠিক তার বিপরীত ভুমিকা রাখছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি সব জায়গাতেই চলছে আপস। আপস করে আখেরে সরকার নিজের এবং দেশের বিপদ ছাড়া আর কিছুই আনছে না।
ভোটের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলের ভোট কখনই আওয়ামী লীগ পাবে না সেটা একদম পরিষ্কার হিসাব। একমাত্র কারণ আদর্শিক। তারা জানে আওয়ামী লীগ কখনই তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার রাস্তা দিবে না। তাই আজকে তারা এজেন্ডা নিয়েছে আওয়ামী লীগের জামাতীকরণ। ঠিক যেমন করে অনেক মুক্তিযোদ্ধার দল হয়েও বিএনপি আজকে জামাতের বিএনপি শাখা।
সরকারের জঙ্গীদমন প্রশংসাযোগ্য এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু কিছু জঙ্গীকে মারলেই এই বিষবৃক্ষ থেকে মুক্তি মিলবেনা। উপড়ে ফেলতে হবে তাদের বোনা সেই বীজটি। যে কাজটি শুরু করেছে স্বৈরাচারী এরশাদ। সংবিধানকে সাম্প্রদায়িক করার মাধ্যমে। রাষ্ট্রকে করতে হবে সাম্প্রিদায়িকতা মুক্ত।
শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোদমে পাল্টাতে হবে। যে শিক্ষা আমাকে সাম্প্রদায়িক হতে শিখায়, যে শিক্ষা আমাকে বিভাজন শিখায়, আমাকে বাঙ্গালী নয় বাংলাদেশী হবার তাগিদ দেয়, আমার দেশের জন্ম নিয়ে বিভ্রান্তি শিখায় সে শিক্ষাব্যবস্থাকে ছুড়ে ফেলার সাহস দেখাতে হবে সরকারকে।
‘সবার আগে দেশ’ এটাকে শ্লোগান হিসাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম হচ্ছে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় কাউকে ধর্মের পরিচয়ে রাষ্ট্র বিবেচনা করবে না সেই শপথ নেবার সময় এসেছে। তরুণ ও যুব সমাজের জন্য আদর্শিক শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। দেশীয় সংস্কৃতির চর্চাকে বাড়ানো দরকার। এর চর্চার ক্ষেত্র প্রসারিত করা দরকার। হারাতে বসা মানবিক শিক্ষাকে সামনে আনতে হবে।
রাজনৈতিক বিদ্বেষ ছাড়িয়ে সবাইকে একটাই আদর্শে সামিল করতে হবে আর তা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ। এর বাইরে যারা রাজনীতি করবে তাদের নিষিদ্ধ করতে হবে সাহসের সাথে।
যে কোন মূল্যে আমি আমার দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ হিসেবে দেখতে চাই। সবাই মিলে একসাথে প্রাণখুলে বাঁচতে চাই। একটা দিনও আমি শংকায় কাটাতে চাই না। জঙ্গীবাদ যেন কেড়ে নিতে না পারে আর কারো প্রাণ।
আমাদের তাজা তরুণদের ফেরত চাই। তারা কাজ করবে দেশ নির্মাণে। মুক্তিযুদ্ধ হবে তার আদর্শিক বিশ্বাস। প্রয়োজনে আরেকবার যুদ্ধ হবে। আবারো চলবে বাংলাদেশকে অন্ধকার মুক্ত করার কাজ। আমি প্রস্তুত, আপনি?
লীনা পারভীন : কলাম লেখক ও সাবেক ছাত্রনেতা।
সূত্র: পরিবর্তন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *