বাংলাদেশকে কাছে টানতে ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতা

কাজী মাহফুজুর রহমান শুভ, টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: চীনের প্রভাব বলয় থেকে বাংলাদেশকে কাছে টানতে মরিয়া প্রতিবেশী দেশ ভারত। ভৌগোলিক দিকে থেকে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে ভারত ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ দেবে বলেও ঘোষণা দিয়েছে। তবে ঐ ঋণের আওয়তায় বাংলাদেশকে দেয়া হবে যুদ্ধাস্ত্র। যার বিপরীতে ভারত চাইছে তাদের সাথে সামগ্রিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে। যদিও ইতোমধ্যে এই প্রতিরক্ষা চুক্তির বিরোধিতা করেছে দেশের রাজপথের বিরোধীদল বিএনপিসহ সমমনা বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তারা বিষয়টি নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন।
বিশ্ব রাজনীতির নানা ব্যাখ্যা আছে। বাস্তববাদীরা মনে করেন, পৃথিবীর ক্ষমতার মেরুকরণ বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকে চালিত করে। শক্তিশালী দেশগুলো ক্ষমতার ভারসাম্য গড়ে তুলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। যারা ক্ষমতার পরিবর্তনের ধারণায় বিশ্বাসী, তাদের মতে, একটি বিশ্বশক্তির প্রাধান্যের কাল শেষ হয় অন্য একটি শক্তির উত্থানের মধ্য দিয়ে এবং বিশ্ব রাজনীতির শান্তি ও স্থায়িত্ব নির্ভর করে ক্ষমতার প্রাধান্যের ওপর, ভারসাম্যের ওপর নয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশকে কাছে টানতে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা করছে প্রতিবেশী ভারত ও চীন।
এশিয়ায় চীন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে তার রয়েছে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছে। এমনিক সুদূর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে চীন বৃহৎ প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করে সেসব দেশে তার অস্তিত্ব ও প্রভাব দৃঢ় করছে। এশিয়ায় বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্ব অনুধাবন করে বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করছে চীন। চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর এ ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। এ পরিস্থিতিতে ভারত তার নিকট প্রতিবেশী বাংলাদেশকে কাছে টানতে অতিশয় আগ্রহী ও সচেষ্ট হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক।
আগামীকাল ভারত সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই সফরে একটি সামগ্রিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে চলেছে মোদি সরকার। স্থির হয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সামরিক সহযোগিতায় ৫০ কোটি ডলার ঋণ দেয়া হবে ঢাকাকে। শুধু তাই নয়, বেশকিছু যুদ্ধাস্ত্রও বাংলাদেশকে দিতে পারে ভারত।
সূত্র মতে, বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়নে বর্তমানে বেশকিছু বড় প্রকল্প চলমান রয়েছে। রামপাল বিদ্যুকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণ, ইঞ্জিন-কোচ ও বাস-ট্রাক ক্রয় থেকে শুরু করে বেশিরভাগ বড় প্রকল্পের কাজই গেছে চীন ও ভারতের ঝুলিতে। সেই সুবাদে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় ভারতীয় সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর নজরদারি এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমশ শক্তি বাড়াতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বেইজিং। আর এজন্যে বাংলাদেশকে পাশে পেতে মরিয়া লালচীন। আর তা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন ভারত। কিন্তু শুধু যে বসে থেকে যে কোনও লাভ হবে না, তা বুঝতে পেরেছে ভারত। এজন্যে চীনকে চাপে রেখে বাংলাদেশকে কাছে পেতে পাল্টা কৌশল মোদি সরকারের।
প্রসঙ্গত, গত কয়েকমাস আগে চীনের কাছ থেকে দু’টি আধুনিক সাবমেরিন কিনেছে বাংলাদেশ। যদিও ঢাকার তরফে জানানো হয়, কয়েকবছর আগে চীনের সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক সেই সাবমেরিনগুলো হাতে পায় বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, ৩০ বছরে প্রথম কোনও চীনা প্রেসিডেন্ট হিসেবে শি জিংফিং-এর ঢাকা সফর। তৃতীয়ত, বেইজিং সম্প্রতি ২৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে বাংলাদেশে, যার একটা বড় অংশ প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে সামরিক হার্ডওয়ার রফতানিতে চীনই এখন এক নম্বরে।
চীনের অর্থায়নে উচ্চব্যয়ের প্রকল্পের একটি কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ, যার প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা, যেখানে পাশের দেশ ভারতে এ ধরনের টানেল নির্মাণে ব্যয় হয় প্রতি কিলোমিটারে ৫০০ কোটি টাকার মতো। এমনকি চীনের ইয়েলো নদীতে যে টানেল নির্মাণ করা হয়েছে, তার ব্যয়ও প্রতি কিলোমিটারে সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা। তার পরও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন ও ভারতের আগ্রহ অগ্রাধিকার পাচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ভারত ও চীনের প্রতি মনোযোগ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
এদিকে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান মনে করেন চীন ও ভারতকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কে কিছুটা পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। এর ভিন্নদিক তুলে ধরে তিনি বলেন, এটা কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং অর্থনৈতিক। আর অর্থনৈতিক বিষয় বলেই যতক্ষণ পর্যন্ত পশ্চিমারা আমাদের থেকে পণ্য কিনে লাভবান হবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করবো। তাই এ বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখা উচিত।
এক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। দেশের মোট রফতানি আয়ের সিংহভাগই আসে এ অঞ্চলগুলো থেকে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব বলছে, গত অর্থবছরেও দেশের মোট রফতানি আয়ের ৬০ শতাংশের বেশি আসে এ দুই অঞ্চল থেকে, চীন ও ভারতের অংশ যেখানে যৎসামান্য। বিদেশি বিনিয়োগের উৎস হিসেবেও এগিয়ে আছে পশ্চিমা বিশ্বই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে পুঞ্জিভূত সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই স্টক) শীর্ষ ২০ গন্তব্যের প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে আছে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। ভারত ও চীনের অবস্থান এক্ষেত্রে যথাক্রমে ১১ ও ১৭তম। বিনিয়োগের পরিমাণেও আছে বড় ব্যবধান। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের এফডিআই স্টকের পরিমাণ যেখানে ৩০০ ও ১০০ কোটি ডলার, ভারত ও চীনের এফডিআই স্টক সেখানে যথাক্রমে ৩৩ কোটি ৮০ লাখ ও ২৩ কোটি ৯ লাখ ডলার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *