পাশ্চাত্যই জাতিগত বৈষম্য ও বর্ণবাদের প্রধান মদদদাতা

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম: জাতিগত বিদ্বেষ বা বর্ণবাদ তথা বর্ণবৈষম্য এমন এক বিষাক্ত মতবাদ যা যুগে যুগে মানব-সভ্যতা এবং মানব-ইতিহাসকে করেছে কলঙ্কিত। আধুনিক যুগও এই কলঙ্কজনক মতবাদের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রেহাই পায়নি। লজ্জাজনক হলেও এটা এক জ্বলন্ত বাস্তবতা।কথিত পশ্চিমা সভ্যতা সাম্য, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের বুলি আওড়াতে অভ্যস্ত হলেও সেখানেও বর্ণবাদ ও বর্ণবিদ্বেষ ক্রমেই বাড়ছে। আর সব ধরনের লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে এই কথিত পশ্চিমা সভ্যতার ধ্বজাধারীরাই মধ্যপ্রাচ্যে জাতিগত বিদ্বেষের বিষবৃক্ষ হিসেবে গড়ে তুলেছে দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলকে। পাশ্চাত্যে মুসলমান ও কালো বর্ণের বা অশেতাঙ্গ নাগরিকরা প্রায়ই নিহত বা নাজেহাল হচ্ছে বর্ণবাদী শাসকগোষ্ঠী, শ্বেতাঙ্গ পুলিশ বা ইসলাম-বিদ্বেষী উগ্র ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর সমর্থকদের হাতে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটলেও আজও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদের অবসান ঘটেনি। ইসলাম বিদ্বেষী সার্বদের হাতে আধুনিক যুগেই নিহত হয়েছে প্রায় দুই লাখ বসনিয় মুসলমান। আর এতে পরোক্ষ সহায়তা ছিল ইসলাম-বিদ্বেষী পশ্চিমা শক্তিগুলোর। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জন মেজর তো প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছিলেন যে ‘ইউরোপে এক নতুন মুসলিম রাষ্ট্রের উদ্ভব সহ্য করা হবে না’। ফলে সেখানকার মুসলমানদেরকে ডেইটন চুক্তির মাধ্যমে সার্ব-ক্রোয়াট ও বসনিয় মুসলিম ফেডারেশনের যৌথ শাসনের আওতায় রাখা হয়েছে। গণহত্যার মূল ঘাতক ও দোসরদের দেয়া হয়নি যথাযথ শাস্তি।
যে বর্ণবাদী নীতির কারণে বসনিয় মুসলমানদের একক নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রকে সহ্য করেনি পাশ্চাত্য সেই একই কারণে তুরস্ককেও ইউরোপীয় জোটের সদস্য করতে রাজি হচ্ছে না ইউরোপ।
জাতিগত দ্বন্দ্ব ও বিদ্বেষকে জিইয়ে রেখে পাশ্চাত্য আজও শোষণ করছে আফ্রিকা মহাদেশের কৃষ্ণকায় জাতিগুলোকে। তৃতীয় সহস্রাব্দেও কথিত আধুনিক ইউরোপ ও পাশ্চাত্যে বর্ণ-বৈষম্যের শিকার হচ্ছে এশিয়ান, আফ্রিকান, রেড-ইন্ডিয়ান এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মত দেশগুলোতে আজও স্থানীয় আদিবাসীরা ফিরে পায়নি তাদের হারানো সম্পদ ও নানা অধিকার। গত কয়েক দশকে তাদের ওপর নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছিল পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গরা। পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গদের বেশিরভাগই আজও দেশ-বিদেশের কৃষ্ণকায় আফ্রিকান জনগোষ্ঠীকে তাদের দাস হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে জাতিগত ও ধর্মীয় বৈষম্য দেখা যাচ্ছে ভারতে, কাশ্মিরে, চীনে, মিয়ানমারে, শ্রীলংকায় এবং এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশেও। সিরিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেনের জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া নৃশংস সহিংসতার পেছনেও রয়েছে পশ্চিমা ষড়যন্ত্রে সৃষ্ট ওয়াহাবি মতবাদের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা। ইহুদিবাদী ইসরাইল ও পশ্চিমা শক্তিগুলোই মধ্যপ্রাচ্যে ধর্মীয় জঙ্গিবাদীদের লেলিয়ে দিয়ে এইসব অশান্তি সৃষ্টি করেছে। আর এ কাজে সহযোগী হয়েছে এ অঞ্চলের কিছু সেবাদাস সরকার ।
পরিহাসের ব্যাপার হল মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমানদের মধ্যে ধর্মের নামে সন্ত্রাস ছড়িয়ে পাশ্চাত্য ও ইসরাইল তাদের নানা স্বার্থ হাসিল করতে চাইলেও এই মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে রাজি নয় পাশ্চাত্য। নয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশে ইরানসহ সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের প্রবেশ ও ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যা বর্ণবাদ ও মুসলিম-বিদ্বেষী পদক্ষেপের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।
আমেরিকা থেকে অবৈধ অভিবাসীদের বের করে দেয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেয়া সিদ্ধান্তকে মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে জাতিসংঘ। কিন্তু তা সত্ত্বেও ট্রাম্প তার বর্ণবাদী সিদ্ধান্তে অবিচল রয়েছেন। তার এই নির্দেশের পর আমেরিকায় মুসলমানদের ওপর হামলা বেড়েছে এবং দেশটিতে ভারতের এক নাগরিককে বর্ণবাদীরা হত্যা করেছে ইরানি মনে করে!
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশে মেক্সিকোর শরণার্থীদের ঠেকানোর জন্য সীমান্তে বর্ণবাদী দেয়াল গড়ারও অমানবিক পরিকল্পনা নিয়েছেন। ট্রাম্প বার বার তার দেশের ভেতরকার মুসলিম এবং অন্যান্য অভিবাসী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বা সহিংস বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ ট্রাম্পসহ সব শ্বেতাঙ্গ মার্কিন নাগরিকের পূর্বপুরুষরাই ছিল অভিবাসী তথা বহিরাগত।
সম্প্রতি ইউরোপীয় জোটভুক্ত ১৪টি দেশ সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যে আইন পাস করেছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাকে ‘মুসলমান এবং শরণার্থীদের প্রতি বৈষম্যমূলক’ বলে অভিহিত করেছে।
এদিকে কর্মস্থলে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করা যাবে বলে সম্প্রতি রায় দিয়েছে ইউরোপীয় আদালত। ব্রিটেন, নেদারল্যান্ড, জার্মানি ও ফ্রান্সের মত দেশগুলোতে ইসলাম ও মুসলিম-বিদ্বেষী তৎপরতার অংশ হিসেবে হিজাব বিরোধি সরকারি পদক্ষেপ ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। ব্রিটেনে চাকরির ক্ষেত্রে মারাত্মক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন হিজাব পরিহিত নারীরা।
ইউরোপের দেশে দেশে উগ্র ডানপন্থী দলগুলো নাগরিকদের মধ্যে বিভেদের বর্ণবাদী দেয়াল গড়ে তুলতে চাইছে। তাদের বিভেদকামী ও উগ্র বর্ণবাদী চিন্তাকে নব্য-হিটলারিজম বা নব্য-নাৎসীবাদ বলে উল্লেখ করা যায়। আর একই ফ্যাসিবাদী চিন্তা নিয়েই তারা ছড়িয়ে দিতে চাইছে ইসলাম-আতঙ্ক ও মুসলিম-বিদ্বেষ। এদেরই এক সমর্থকের হাতে কয়েক বছর হাতে জার্মানির এক আদালতের ভেতরেই নিহত হয়েছিল মিশর থেকে আসা হিজাবধারী যুবতি অভিবাসী শেরবিনি।

মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া ইহুদিবাদী ইসরাইলের বর্ণবাদী তৎপরতা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ঘর-বাড়ি আর কৃষি-খামার ধংস করে, ফিলিস্তিনিদের জমি দখল ও সেসব জমিতে অবৈধ ইহুদি উপ-শহর নির্মাণ করে এবং প্রায়ই নিরাপত্তার অজুহাতে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে বর্ণবাদী নৃশংসতা অব্যাহত রেখেছে পশ্চিমা মদদপুষ্ট ইসরাইল।

একইসঙ্গে ইহুদিবাদী ইসরাইল গাজার ১৫ লাখ ফিলিস্তিনির ওপর সর্বাত্মক নৃশংস অবরোধ অব্যাহত রেখেছে। অথচ ইসরাইলের এসব নৃশংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না জাতিসংঘ ও তথাকথিত মানবাধিকারকামী পাশ্চাত্য।

পাশ্চাত্যের বর্ণবাদী নীতির কারণেই ইহুদিবাদী ইসরাইল শতাধিক পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হয়েও পশ্চিমা কোনো অবরোধ বা নিন্দার মুখোমুখি হয়নি। অথচ ইসলামী রাষ্ট্র ইরান শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি আয়ত্ত্বের দায়ে কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও চাপের শিকার হয়েছে।

সম্প্রতি জাতিসংঘের পশ্চিম এশিয়া বিষয়ক অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের সভাপতি রিমা খালাফ ইহুদিবাদী ইসরাইলকে ‘বর্ণবৈষম্যবাদী সরকার’ হিসেবে অভিহিত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় শেষ পর্যন্ত তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। ১৯৭৫ সালে পাশ হওয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ঐতিহাসিক ৩৩৭৯ নম্বর প্রস্তাবে ইসরাইলকে বর্ণবাদী সরকার বলে অভিহিত করা হয়েছিল। ইসরাইল অন্তত ৭০ বার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নির্দেশ ও প্রস্তাব লঙ্ঘন করেছে।

আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা বিশ্লেষক এবং মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিফেন ওয়াল্ট ও জন মায়ার শাইমারের লেখা ‘ইহুদিবাদী লবি ও মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি’ শীর্ষক একটি বইয়ে লিখেছেন, ইসরাইল অবাধে ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল করছে এবং অবৈধভাবে ইহুদি বসতি নির্মাণ করছে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী আচরণের এটি এক বড় দৃষ্টান্ত। ইসরাইল এমনভাবে পশ্চিম তীরে প্রাচীর নির্মাণ করছে যাতে ফিলিস্তিনিদের নানা শহর ও গ্রাম পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু সম্প্রতি প্রখ্যাত মার্কিন চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি বলেছেন, বর্তমানে ইসরাইল যা করছে তা বর্ণবাদের চেয়েও অনেক বেশি নিকৃষ্ট বা গুরতর অপরাধ।

সূত্র: পার্সটুডে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *