বাপাপিটাখেতেগিয়েভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য : দুর্ভোগ চরমে

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: রাজধানীতে সিটিং, গেটলক ও স্পেশাল নামধারী বাসগুলোর লোকাল চলার শুরুর প্রথম দিনেই ভাড়া নিয়ে চরম বাড়াবাড়ি হয়েছে। মিনিবাসে সর্বনিন্ম ৫ টাকা ও অন্য বাসে ৭ টাকা আদায়ের নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি। বাসগুলোতে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চার্ট ছিল না। শুধু তাই নয়, স্পেশাল ও সিটিং সার্ভিসগুলো আগে যে ভাড়া আদায় করত রোববার সেই বাড়তি ভাড়াই আদায় করা হয়েছে। এ নিয়ে বাসচালক ও কন্ডাকটরের সঙ্গে যাত্রীদের তর্কাতর্কি, হইচই, হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে কোথাও শ্রমিকদের মারধরের শিকার হয়েছেন যাত্রীরা।ক্ষুব্ধ যাত্রীরা জানিয়েছেন, সির্টিং সার্ভিস লোকাল হয়েছে, কিন্তু ভাড়া কমেনি। লোকাল বাসের মতো যাত্রী তুলছে। অথচ সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় করছে। এহেন ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে বিআরটিএ ও পুলিশ প্রশাসনকে অভিযান জোরদার করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিআরটিএ ও মালিকদের পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী রোববার থেকে রাজধানীতে সিটিং বা স্পেশাল বাস সার্ভিস বন্ধ করে লোকাল চলার কথা। ভাড়া আদায় করার কথা সরকার নির্ধারিত হারে। গাড়িতে থাকার কথা ভাড়ার চার্ট। নির্ধারিত স্টপেজে যাত্রী উঠা ও নামানোর কথা।
কিন্তু সরেজমিন দেখা গেছে, বাসগুলোতে লোকাল যাত্রী তোলা হয়েছে। গরমের মধ্যে গাদাগাদি করে যাত্রী তোলা হয়েছে। তবে বেশিরভাগ বাস ও মিনিবাসে সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করেছে। সামান্য কিছু বাসে সরকার নির্ধারিত হারে ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে।
মিরপুর থেকে ফার্মগেট আসা একটি গ্রুপ অব কোম্পানির কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, দিশারী পরিবহনের বাসে সিটিং সার্ভিস অবস্থায় চলাকালে মিরপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত ১৫ টাকা আদায় করত।

রোববার ওই পরিবহনের বাসে উঠলেই কারও কাছ থেকে ১০ আবার কারও কাছ থেকে ১৫ টাকা ভাড়া আদায় করেছে। এ কারণে যাত্রীরা হইচই করেন। বাসের কন্ডাকটরও যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। তিনি প্রশ্ন করেন, আগের মতোই যদি বাড়তি ভাড়া দিতে হবে, তাহলে এটা করে লাভ কী হল?

বিআরটিএর চার্টে দেখা গেছে, মিরপুর-১ থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত দূরত্ব ৭ দশমিক ২ কিলোমিটার। বাসে প্রতি কিলোমিটার ১ টাকা ৭০ পয়সা হিসাবে এ পথের ভাড়া দাঁড়ায় ১২ টাকা ২৪ পয়সা এবং মিনিবাসে প্রতি কিলোমিটার ১ টাকা ৬০ পয়সা হিসাবে ভাড়া দাঁড়ায় ১১ টাকা ৫২ পয়সা। অথচ ওই রুটে চলাচলকারী বাসগুলোতে ১৫ টাকা ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে।

সরেজমিন আরও দেখা গেছে, মিরপুর থেকে গাজীপুরগামী বসুমতি গাড়িতে আগের মতোই বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। রোববার মিরপুর থেকে উত্তরা পর্যন্ত সর্বনিন্ম ভাড়া ৩০ টাকা ও গাজীপুর পর্যন্ত ৫৫ টাকা আদায় করা হয়েছে। বাড়তি ভাড়া আদায়ের প্রতিবাদ করায় রোববার মিরপুরে যাত্রীদের মারধর করে পরিহন শ্রমিকরা।

অথচ গাড়ির মালিক ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ, যিনি বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে সড়কে সোচ্চার।

পোস্তগোলা থেকে উত্তরা দিয়াবাড়ী রুটে চলাচলকারী রাইদা পরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন যাত্রী মো. শাহ আলম খান। তিনি বলেন, মালিবাগ আবুল হোটেল থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা পর্যন্ত ২০ টাকা ভাড়া নিয়েছে। অথচ এ পথের ভাড়া ১০ টাকা বেশি হওয়ার কথা নয়।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) জানিয়েছে, বাস ও মিনিবাসে সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি ভাড়া আদায়ের প্রমাণ পেয়েছেন তারা। অনেক বাসে ভাড়ার তালিকা ছিল না। এছাড়া গাড়িতে অ্যাঙ্গেল ও বাড়তি সিট পাওয়া গেছে অনেক গাড়িতে।

এসব অপরাধে রাজধানীর পাঁচটি স্থানে পাঁচজন ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে ১২২টি মামলা করেছেন। জরিমানা আদায় করেছেন ২ লাখ ৯০ হাজার ৬০০ টাকা। জব্দ করা হয়েছে ৩টি গাড়ি। এছাড়া লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর দায়ে ৪ জনকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

সরেজমিন আরও দেখা গেছে, অন্যদিনের তুলনায় রোববার গাড়ি চলাচলের সংখ্যা কম ছিল। এতে যাত্রীরাও দুর্ভোগের শিকার হন। আবার অনেক গাড়ি যত্রতত্র যাত্রী তুলতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছে। এতে যাত্রীদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। জানা গেছে, মোবাইল কোর্টের সাজা এড়াতে এবং লোকাল সার্ভিস হিসেবে না চালানোর সিদ্ধান্তের কারণে অনেক বাস মালিক গাড়ি নামাননি। এতে পরিবহন সংকটের সৃষ্টি হয়।

এদিকে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরে না আসা পর্যন্ত অভিযান চলবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। রোববার তেজগাঁও সাতরাস্তায় গাড়ির বাম্পার, অ্যাঙ্গেল ও হুক খোলার অভিযান পরিদর্শনে গিয়ে যাত্রীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরে না আসা পর্যন্ত অভিযান চলবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এখানে ভাড়ায় বিশৃঙ্খলা। চলাচলে বিশৃঙ্খলা। প্রকৃত যারা পয়সা দিয়ে গাড়িতে ওঠেন তারা বসতে পারেন না, দাঁড়িয়ে থাকেন। বাসগুলো খুবই ওভার লোডিং হয়। তিনি বলেন, ‘সিটিং সার্ভিস বন্ধ হলে জনগণ এর সুফল পাবে। এখানে ডিসিপ্লিন মোস্ট ইমপর্টেন্ট, ডিসিপ্লিন ফিরে এলে এর সুফল জনগণই পাবে। যতদিন না শৃঙ্খলা ফিরে আসে ততদিন অভিযান চলবে।’

বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) নাজমুল আহসান মজুমদার জানান, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ, গাড়িতে ভাড়ার চার্ট টানানো নিশ্চিত করা এবং অনুমোদনের বাইরে সিট ও অ্যাঙ্গেল রয়েছে এমন গাড়ির বিরুদ্ধে রোববার বিআরটিএ’র পাঁচজন ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন। এ অভিযান নিয়মিত করা হবে। অভিযানে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারাও সহযোগিতা করছেন।

সরেজমিন ঘুরে আরও দেখা যায়, মাওয়াঘাট থেকে আসা স্বাধীন এক্সপ্রেস ‘সিটিং সার্ভিস’ (ঢাকা মেট্রো-ব ১৪-৮১৯১) লেখা একটি বাস বেলা পৌনে ১২টায় গুলিস্তান মোড়ে এসে দাঁড়ায়। সেখান থেকে এই প্রতিবেদক বাসটিতে উঠতেই কন্ডাকটর বললেন, ‘ভাই সিটিং সার্ভিস, কোথায় যাবেন? মিরপুর ১০ নম্বর যাব-বলতেই ওই কন্ডাকটর বললেন, ‘বসেন, তবে তাড়াতাড়ি ভাড়া দেন।’

বাসটি রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট বরাবর আসতেই ৩-৪ জন আনসার সদস্য বাসটিকে দাঁড় করায়। ওই সময় বাসে থাকা হেল্পার ও কন্ডাকটর নেমে আনসার সদস্যদের সঙ্গে রফাদফা করছিল। লাইসেন্স রাখা একটি সবুজ প্যাকেটে ৫শ’ টাকার একটি নোট ভরে দেয় কন্ডাকটর নাসিম। টাকাসহ ওই প্যাকেটটি নিয়ে সঙ্গীয় আনসার সদস্যরা কিছুটা সময় বিলম্ব করেন।

এদিকে বাসচালক তার আসনে বসে বসে কন্ডাকটরের উদ্দেশে বলছিল, ‘তাড়াতাড়ি কর, ঝামেলা মিটা, জলদি কর।’ দু’জন আনসার সদস্য প্যাকেটটি নিয়ে মোবাইল কোর্ট পর্যন্ত গিয়ে পুনরায় চলে এলেন বাসের কাছে। তখন দুপুর সাড়ে ১২টা।

মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ মো. মাজহারুল ইসলামের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা মেট্রো-ব ১৪-৮১৯১ নম্বর স্বাধীন এক্সপ্রেস নামে কোনো মামলা হয়নি। কন্ডাকটর নাসিম জানান, আনসার সদস্যরাই বাঁচালেন। ওই জায়গা (মোবাইল কোর্ট) পর্যন্ত যেতে হয়নি। বিনিময়ে ৫শ’ টাকা দিতে হয়েছে।

ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের খানিকটা সামনে ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৩৫৯৮ নামক বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাস দাঁড় করিয়ে চালক মো. আলমগীর হোসেন বাসের ভেতর তাড়াহুড়া করে লুঙ্গি পাল্টিয়ে প্যান্ট পরছিলেন। নিচ থেকে ২ জন আনসার সদস্য বলছিলেন, লুঙ্গি পরা অবস্থায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে গেলেই জরিমানা এমনকি জেলও হতে পারে। ওই সময় ওই বাসটির পেছনে দাঁড়ানো বিহঙ্গ পরিবহন ঢাকা মেট্রো-ব ১১-৩৩২২ নম্বর বাসে যাত্রীরা চিৎকার করছিল।

ম্যাজিস্ট্রেটকে উদ্দেশ করে বলছিল, ‘অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কথা। ৩-৪ যাত্রী বাস থেকে নেমে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নালিশ করলেন, ১০ টাকার নিচে তারা ভাড়া নিচ্ছে না। অথচ সরকারি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বনিন্ম ৭ টাকা।

যাত্রীদের অভিযোগের ভিত্তিতে চালক আলীম খানকে ৭ দিনের জেল দেন ম্যাজিস্ট্রেট।

মিরপুর থেকে গুলিস্তান ও মতিঝিল চলাচলকারী বাসগুলোর সর্বনিন্ম ভাড়া ১০ টাকা থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেন। মিরপুর ১০ নম্বর থেকে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত চালাচলকারী প্রজাপতি পরিবহন ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৮৫৭০ নম্বরে চড়ে বিশ্বরোড পর্যন্ত আসতে এই প্রতিবেদককে ভাড়া দিতে হয়েছে ৩০ টাকা।

প্রজাপতি পরিবহনের সুপারভাইজার কবির হোসেন জানান, প্রজাপতি পরিবহন রাজধানীতে ৯০টি চলাচল করত, এখন মাত্র ১২-১৫টি চলছে। গাড়ি চালাতে গিয়ে প্রায়ই চালক, হেল্পার ও কন্ডাকটররা যাত্রীদের হাতে মার খাচ্ছে। চালকরা গাড়ি চালাতে চাচ্ছেন না।

একাধিক যাত্রী জানান, মিরপুর থেকে আবদুল্লাহ পর্যন্ত পর্যন্ত ভাড়া ৩০ টাকা। কিন্তু এ রুটে প্রতি বিরতিতে ৭ টাকা করে ভাড়া হলেও নেয়া হচ্ছে ১০ টাকা। তাতে মিরপুর থেকে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা।

এদিকে আগের মতোই রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ওয়েবিল সই করিয়ে বাস চলছে। খামারবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ওই স্থানে মিরপুর ও সাভারগামী ওয়েলকাম, স্বজন, দিশারী, এভারেস্ট, নিউ ভিশন, তানজিলসহ কয়েকটি পরিবহনের কর্মীরা ওয়েবিলে যাত্রী সংখ্যা লিখে দিচ্ছেন।

পরিবহন কর্মীরা জানান, ওয়েবিলে যাত্রীসংখ্যা লেখার পর যেখানেই যাত্রী নামবে ১৫ টাকা আদায় করা হতো। এখন তা কমিয়ে ১০ টাকা নেয়া হচ্ছে।

ওয়েলকাম পরিবহনের কর্মী অনিক বলেন, গাড়িতে কতজন যাত্রী উঠছেন তার হিসাব রাখতেই ওয়েবিলে সই করা হচ্ছে। তবে সরকার নির্ধারিত হারে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে, সিটিং সার্ভিস বন্ধ হলেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়েছে। অনেক মালিক গাড়ি বন্ধ রেখেছেন। যেসব যানবাহন চলেছে সেগুলো লোকাল যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করলেও আগের মতো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেছে।

বাড়তি ভাড়া আদায় ও গণপরিবহনে এসব নৈরাজ্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পরিবহন নেতা খন্দকার এনায়েত উল্যা বলেন, পাঁচটি স্থানে মোবাইল কোর্টের পাশাপাশি আমাদের লোকজন রয়েছে। আমি নিজেও দুটি স্থানে উপস্থিত থেকে কাজ করছি। পরিবহনে দীর্ঘদিনের অনিয়ম একদিনে যাবে না। এজন্য কিছু দিন সময় দিতে হবে।
সূত্র: যুগান্তর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *