নির্বাচনে জিততে হেফাজতকে কাছে টানছে আ’লীগ

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেকোনো মূল্যে জয় পেতে চায় ১৪ দলীয় জোটের নেতৃত্বাধীন সরকারি দল আওয়ামী লীগ। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী এবং জামায়াতবিরোধী ছোট ছোট ধর্মভিত্তিক দল ও কওমিপন্থীদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন শুরু করেছে সরকারি দলটি। শুধু তাই নয়, ইতোমধ্যেই হেফাজতে ইসলামের দাবির মুখে কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতিও দিয়েছে সরকার। একইসাথে সুপ্রিম কোর্ট চত্বর থেকে গ্রিক দেবীর ভাস্কর্য অপসারণ ইস্যুতে হেফাজতসহ ইসলামি দল ও সংগঠনগুলোর দাবির প্রতি মৌন সমর্থনও দিয়েছে। তবে এই বিষয়টিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখছেন দলের হাইকমান্ডের নেতারা। একই কথা বলছেন তৃণমূলের নেতারাও। আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ধর্মভিত্তিক ছোট দল-সংঠনগুলোর প্রায় ১ কোটি ভোট কাছে টানতেই আগামী নির্বাচনের পৌনে ২ বছর আগেই কওমিপন্থীদের প্রতি নমনীয় ভাব দেখাচ্ছে সরকার। তাদের মতে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার মনে করছে, জামায়াতবিরোধী এসব ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠনকে খুশি রাখতে পারলে আগামীতে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ (২০১৯ সাল) নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার সহজ হবে।
জানা গেছে, কওমির মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেয়ার মধ্য দিয়ে প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থীসহ কওমিপন্থী প্রায় ১ কোটি ভোটারের হিসাব কষছে আওয়ামী লীগ। কওমি সনদের স্বীকৃতি দেয়ার মধ্য দিয়ে ইসলামি শিক্ষার প্রতি আওয়ামী লীগের ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রমাণ দেয়ার পাশাপাশি তাদের ভোটও আশা করছে। নতুন এই ভোটগুলো এলে নির্বাচনের মাঠে আওয়ামী লীগের জন্য সুফল নিয়ে আসবে।
ড. জায়েদ মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ্ বলেন, ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। এদেশের মানুষ ধর্মভীরু। তাই তাদের স্বার্থে আঘাত লাগে এমন কিছু করবে না সরকার। অপরদিকে দেশের দৃশ্যমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আবারও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় থাকতে হবে। এজন্যই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে হয়তো দলীয় প্রধান নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করছেন। হেফাজতের সাথে সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের এই নেতা।
সরকারি দলের নীতি-নির্ধারণী সূত্রগুলোর মতে, হেফাজতকে এই মুহূর্তে সাথে রাখলে শেষ পর্যন্ত তারা পক্ষে না থাকুক, বিপক্ষেও যেতে পারবে না। সেটা হবে আওয়ামী লীগের জন্য এক ধরনের সফলতা। তাদের মতে, হেফাজতসহ কওমিপন্থী বৃহৎ এ গোষ্ঠী নির্বাচনের আগে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিএনপি’র দিকে ঝুঁকে গেলে তাতে নানা সংকট দেখা দিতে পারে। সরকারি দলটি মনে করে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করলেও ২০১৯ সালের নির্বাচন কোনোমতেই তারা বর্জন করবে না। নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে কোনো ধরনের সমাঝোতা না হলেও বিএনপি নির্বাচনে আসবে। বিএনপি নির্বাচনে এলে তা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। বিষয়টি তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাসও করেন। কাজেই বিএনপি’র সাথে নির্বাচন করতে গেলে অবশ্যই আওয়ামী লীগকে ভোটের অঙ্ক নিয়ে ভাবতে হবে। আর এই ভাবনার অংশই হচ্ছে কওমিপন্থীদের কাছে ডাকা।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগামী নির্বাচনকে মাথায় রেখেই হেফাজতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন। আর কওমি সনদের স্বীকৃতির মূলেই রয়েছে সরকারের হিসাব-নিকাশ। তাদের নার্সিং করা গেলে ভোটের রাজনীতিতে একটি সুফল আমাদের পক্ষে আসবে। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেরই ভোটের হিসাব মাথায় থাকে। আওয়ামী লীগও এর বাইরে নয় বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে হেফাজতের সাথে তাদের সম্পর্ক কৌশলগত বলে দাবি করেন। তবে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, কওমি সনদের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে বা ভাস্কর্য সরানোর পক্ষে কথা বলা হয়েছে, এর অর্থ এই নয় যে, হেফাজতে ইসলামের সাথে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে মূল্যায়নের অনেক সময় পড়ে রয়েছে বলে জানান তিনি। সভাপতিম-লীর আরেক সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, কওমিকে স্বীকৃতি দেয়ার মানে হেফাজতের সাখে সখ্য নয়, একটি গণদাবি বিবেচনায় নিয়ে সরকার কেবল স্বীকৃতি দিয়েছে। এর বাইরে আর কিছুই নয়। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, হেফাজত বা কওমিদের স্বীকৃতি নিয়ে এখনই এত সমালোচনা কেন? তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মূলধারায় নিয়ে আসতে পারলে অসুবিধা কোথায়? সরকার তো শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নয়, ১৬ কোটি মানুষেরও। তাদেরও দেখার দায়িত্ব সরকারের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *