ঝুলে আছে ড্যাপ বাস্তবায়ন

শামীম চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির ফাঁদে ঝুলে আছে বহুল আলোচিত রাজধানীর ডিটেইল্ড এরিয়া প্লান (ড্যাপ)। ২০১০ সালের ২২ জুন ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশ করে সরকার। পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশগুলো আরও রিভাইস করে আন্ত্রঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশের আলোকে এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়নের তেমন কোনো লক্ষণ নেই বললেই চলে। ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে যেমন ড্যাপ বাস্তবায়ন করা জরুরি যা একবাক্যে স্বীকার করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রীও। তারই নির্দেশনা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তৎকালীন সময়ে যা গেজেট আকারে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নে বাধসাধে ড্যাপ এলাকার বিভিন্ন হাউজিং ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। যাদের আপত্তির প্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, পানিসম্পদ, ভূমি, নৌপরিবহণ, যোগাযোগ এবং বন ও পরিবেশ ৭ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়।
জানা গেছে, ড্যাপ রিভিউয়ের লক্ষ্যে গঠিত ঐ মন্ত্রিসভা কমিটির ১১তম মুলতবি সভা গত ১৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশারফ হোসেন স্বীকারও করেছেন, ঢাকাকে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে দ্রুত ডিটেইল্ড এরিয়া প্লান (ড্যাপ) বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। তবুও কেন ঝুলে আছে এর বাস্তবায়ন? এমন প্রশ্নের জবাব মেলেনি।
তবে সভাশেষে মন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় গঠিত কমিটির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ঢাকার প্রাকৃতিক জলাশয়সমূহ অবশ্যই রক্ষা পাবে। তিনি আধুনিক ও বসবাস উপযোগী হিসেবে ঢাকা মহানগরীকে গড়ে তুলতে ভূমির ব্যবহার ও স্থাপনা নির্মাণে প্রচলিত আইন-কানুন যাতে সবাই মেনে চলে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে বলেন।
জানা গেছে, এতো বছর পর অবশেষে ড্যাপে উত্থাপিত প্রাথমিক আপত্তিসমূহ এ মুলতবি সভায় নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ড্যাপ রিভিউয়ের ক্ষেত্রে উত্থাপিত আপত্তি ও আবেদনসমূহ সরেজমিনে তদন্ত করার নির্দেশনা প্রদান করেন।
যদিও বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন গত সরকারের সময়ে ড্যাপ নিয়ে তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নানের সাথে ডেভেলপার, হাউজিং সোসাইটি ব্যবসায়ীদের বিরোধ সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে হাউজিং সোসাইটি ব্যবসায়ী প্রকাশ্যে প্রতিমন্ত্রীকে হুমকিও দেন। এরপর থেকেই মূলত বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। কিন্তু তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী ড্যাপ বাস্তবায়নে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তা রিভিউ করার জন্য কমিটি গঠন করা হয়।
এদিকে, ঐ ক্ষমতাশালী ডেভেলপার ও হাউজিং কোম্পানিগুলোর অপতৎপরতার কারণে ড্যাপ বাস্তবায়ন আরও বিলম্বিত হতে পারে বলে খোদ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। ফলে রাজধানীকে পরিকল্পিত, জলাধার সংরক্ষণ এবং পরিবেশ সমুন্নত রেখে শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য প্রণীত এ পরিকল্পনাটি ক্রমেই হিমাগারে চলে যাচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক ড্যাপ বাস্তবায়নে কোনো বাধা নেই বলে দাবি করে আসছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ২০০৪ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ধরা হলেও বিগত বছরগুলোতে কয়েকটি কমিটি গঠন এবং সুপারিশমালা তৈরির মধ্যে কাজটি সীমাবদ্ধ রয়েছে। গেজেট প্রকাশের পর মাস গড়িয়ে কয়েকটি বছর পার হলেও এর অগ্রগতি থেমে গেছে ঐ কমিটির কাছে।
গত ২০১০ সালে মাঝামাঝি সময়ে এ পরিকল্পনা নিয়ে নানা আলোচনার সূত্রপাত হয়। আন্দোলন হয় পক্ষে-বিপক্ষে। যদিও পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন ইনস্টিটিউট অব প্লার্নাস (বিআইপি)সহ কয়েকটি সংগঠন এর বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। কয়েকটি সুপারিশও পেশ করে সরকারকে। বিপরীতে এর বাস্তবায়নের বিপক্ষে দাঁড়ায় খোদ সরকারের কয়েকজন সংসদ সদস্য। ফলে এ নিয়ে মন্ত্রণালয় এবং রাজউক বিপাকে পড়ে। কয়েকজন সংসদ সদস্য তাদের বিষয়টি নিয়ে আলাপ করার জন্য মন্ত্রণালয়কে চিঠিও লেখেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে পরে পুরো বিষয়টি আরও আলোচনার জন্য ৭ মন্ত্রণালয়কে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সর্বসাধারণের আপত্তি বা সুপারিশ প্রদানের বিধানের কথা উল্লেখ রেখে ২০১০ সালের ২২ জুন ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে সরকার। টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩ (ইবি অ্যাক্ট ১৩-১৯৫৩)-এর সেকশন ৭৩-এর আওতায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার (৫৯০ বর্গমাইল) এলাকা ড্যাপের মহাপরিকল্পনার অধীনে এ গেজেট নোটিফিকেশন প্রকাশ করা হয়। এর আওতাধীন অঞ্চলগুলো হচ্ছে- গাজীপুর পৌরসভা থেকে উত্তর দিকে, ধলেশ্বরী নদী থেকে দক্ষিণ দিকে, বংশী ও ধলেশ্বরী নদী থেকে পশ্চিম দিকে এবং শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদী থেকে পূর্ব দিকে। বর্তমানে ড্যাপের পরিকল্পনাকে সামনে রেখেই নানা প্রকল্প অনুমোদন করছে রাজউক।
সূত্র আরও জানায়, পরিকল্পিত রাজধানী এবং এর জলাধার সংরক্ষণ এবং পরিবেশকে সমুন্নত রেখে শিল্পকারখানা স্থাপন ১৯৯৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা মেট্রোপলিটন ডিটেইল প্লান (ডিএমডিপি) অনুমোদন করে গেজেট প্রকাশ করে। ড্যাপ প্রণয়নের পদক্ষেপ নেয়া হয় ২০০৪ সালে। ২০০৬ সালে এটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। সে লক্ষ্যে মহানগর এলাকাকে ৪ ভাগে বিভক্ত করে ৪টি আলাদা প্রতিষ্ঠানকে ড্যাপ প্রণয়নের কাজ দেয়া হয়। কিন্তু তারা মোট ২০ খ-ে ড্যাপ দাখিল করে ২০০৭ সালে। পরে রাজউক পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে এই ড্যাপের ওপর মতামত আহ্বান করে। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও ড্যাপ নিয়ে সরকারি পর্যায়ে সভা-আলোচনা হয়।
২০০৯ সালে ১ জানুয়ারি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে ৬ সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি করা হয় ড্যাপ প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার জন্য। পর্যালোচনা কমিটি ১৬টি আবাসন প্রকল্প ও স্থাপনা এবং ২ হাজার ৭শ ২৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে ড্যাপের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ (নন-কনফর্মিং) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জেই আছে ২ হাজার ১শ ৩৫টি। কমিটি প্রকল্পগুলো অনুমোদন না দিতে এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সরিয়ে নেয়ার সুপারিশ করেছে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৬টি সরকারি ও ১০টি বেসরকারি। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী।
তবে ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ড. জহুরুল হক জানান, এর বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো বাধা নেই। গেজেট প্রকাশের পর এটি একটি আইনে পরিণত হয়। তাছাড়া এটি সুপারিশ আকারে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় যদি প্রয়োজন মনে করে মতামতের জন্য আমাদের ডাকবে।
এদিকে সম্মিলিত জলাধার রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, গেজেট প্রকাশের পর এটি একটি আইনে পরিণত হলে তা বাস্তবায়ন করতে দেয়া হচ্ছে না। এর নেপথ্যে যারা কলকাঠি নাড়ছেন তারা মূলত ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে চায় না। তাদের ঢাকাবাসীর শত্রু আখ্যা দিয়ে এই নগর উন্নয়নকর্মী বলেন, একটি মহল তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে ঢাকাকে ক্রমশ বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে। যার খেশারত গুণতে হবে আগামী প্রজন্মকে।
এ ব্যাপারে নগর বিশেষজ্ঞ স্থপতি ইকবাল হাবিব জানান, ১৯৫৯ সালের পর ঢাকার জন্য পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার এবং অবৈধ সমন্বয়হীন কাজ ঠেকাতে একটি দলিল তৈরি হলো। তাও আলোর মুখ দেখবে না বলে আমরা শঙ্কিত। একটি রাজনৈতিক মহল স্বার্থ উদ্ধার করার জন্য এবং অজ্ঞতার কারণে তারা বিরোধিতা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *