ভারতের বেহাত হচ্ছে কাশ্মীর?

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম: ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে স্বাধীনতাকামীদের সর্বশেষ হামলায় তিনজন ভারতীয় সেনা এবং দুজন বিদ্রোহী নিহত হয়েছে বলে ভারতের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো থেকে জানা যায়। ভারত পাকিস্তানের বিতর্কিত সীমানা লাইন অব কন্ট্রোল-এলওসি তে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। ভারতীয় সেনা বাহিনীর অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭০ হাজার মানুষ মারা গেছে বলে জানায় পাকিস্তানের প্রভাবশালী ইংরেজি পত্রিকা দ্য ডন।
কাশ্মীরে বিদ্রোহী ও স্বাধীনতাকামী আন্দোলন দমনের নামে ১৯৮৯ সাল থেকে ৫ লাখ ভারতীয় সেনা সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বিদ্রোহী ও ভারতীয় সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১০০ এর অধিক বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে কয়েক হাজার।
ভারতীয় সেনা সদস্যদের উপর নিয়মিত হামলায় সেনা সদস্য হতাহত হচ্ছে। চলমান উত্তপ্ত অবস্থা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার জন্য কাশ্মীরে ২২টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ ঘোষণা করেছে। কিন্তু তারপরও ভারতীয় সেনাদের উপর হামলা ঠেকানো যাচ্ছে না। সবশেষ, অস্ত্র ও গ্রেনেড হামলায় ৩ ভারতীয় সেনা নিহত হয়।
চলমান এই উত্তপ্ত অবস্থার প্রসঙ্গ তুলে বিবিসি নিউজ অনলাইনের ভারত সংবাদদাতা সৌতিক বিশ্বাস প্রশ্ন তুলেছেন কাশ্মীর কি ভারতের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে? আর এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখান মুসলমান-অধ্যুষিত কাশ্মীর উপত্যকায় গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী গ্রীষ্ম ছিল গতবারেরটি। জুলাইয়ে ভারতীয় বাহিনীর হাতে প্রভাবশালী সশস্ত্র নেতা বুরহান ওয়ানী খুন হওয়ার পর সেখানে ৪ মাস ধরে যে অচলাবস্থা চলেছে, তখন সংঘাতে শতাধিক বেসামরিক ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছে।
চলতি গ্রীষ্মকালটিও খুব একটা ভালো যাবে বলে মনে হচ্ছে না। এই মাসে শ্রীনগরে সংসদীয় যে নির্বাচন হয়েছে, তাতে সহিংসতা হয়েছে আর ভোট পড়েছে রেকর্ড পরিমাণ কম, মাত্র সাত ভাগ। এমন কিছু ভিডিও বেরিয়েছে যাতে দেখা গেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারতীয় শাসনেরবিরোধী তরুণদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অনেকে। ফলে আগুনে আরও ঘি পড়েছে। বিক্ষোভ আরও ছড়িয়েছে, ছাত্ররা রাস্তায় নেমে এসেছে। আর খুব বিরল একটা দৃশ্যও চোখে পড়ছে- স্কুলের মেয়েরা পাথর ছুড়ছে, আর তা আঘাত করছে পুলিশের গাড়িকে। কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আঞ্চলিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ফারুক আবদুল্লাহ এ বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে ভারত কাশ্মীর হারাচ্ছে।
ভারতের দাবি, কাশ্মীর অঞ্চলে এখন তাদের ৫ লাখ সৈন্য রয়েছে, ফলে এলাকাটি তাদের হাতছাড়া হবে না। কিন্তু বিশ্লেষক শেখর গুপ্ত বলছেন যে কাশ্মীর ভূখণ্ডগতভাবে নিরাপদ, কিন্তু আমরা একে অনুভূতিগত আর মানসিকভাবে হারিয়ে ফেলছি। তিনি বলেন, শ্রীনগরের নির্বাচনে মাত্র ৭ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি এটাই প্রমাণ করে যে কাশ্মীরের ভূখণ্ডের ওপর আপনার কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকলেও আপনি এর মানুষদের হারাচ্ছেন।
তাহলে কাশ্মীরে এমন নতুন কী ঘটছে যা ভারতকে উদ্বিগ্ন করছে, আর সিনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের এটা স্বীকার করতে বাধ্য করছে যে পরিস্থিতি সেখানে সত্যিই ভঙ্গুর?
একটি হলো, আরও বেশী বেপরোয়া ও বিচ্ছিন্ন একটি তরুণ প্রজন্ম এখন কাশ্মীরে ভারতবিরোধী প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিচ্ছে। উপত্যকার ৬০ শতাংশেরও বেশী পুরুষের বয়স ৩০-এর নীচে। এদের বেশীরভাগই বিক্ষুব্ধ ও বিভ্রান্ত।
আয়জাজ – বাডগামের ১৯ বছরের তরুণ। তিনি বলছেন যে “ভারতীয় নিপীড়নের মুখে” তাদের প্রজন্ম সব আশা হারিয়েছে, আর তিনি ও তার বন্ধুরা “মত্যুকে আর ভয় করেন না”।
তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো যে তার জীবনের লক্ষ্য কী ছিলো, তখন তিনি জানালেন যে তিনি একজন আমলা হয়ে কাশ্মীরকে সেবা করতে চেয়েছিলেন।

“এটা বলা ভুল যে কাশ্মীরের ঐ যুবক নির্ভীক হয়ে উঠেছে, সে আসলে বিচ্ছিন্ন বোধ করছে, অপমানিত বোধ করছে। তিনি যখন এমনটা বোধ করেন, তখন ভয় আর কাজ করে না। তিনি হয়ে ওঠেন অপরিণামদর্শী। এটা বিচার-শক্তিহীন আচরণ,” ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা জুনায়েদ আজিম মাত্তু বলছিলেন বিবিসি সংবাদদাতাকে।
দ্বিতীয়ত: নতুন প্রজন্মের ‘বিদ্রোহী’রা শিক্ষিত এবং তুলনামূলক ভাবে ধনী পরিবার থেকে আসা।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর যে নেতাকে হত্যা করা হয়েছে, সেই বুরহান ওয়ানী একটি উচ্চ-শিক্ষিত উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে এসেছিলেন। তার বাবা সরকারি স্কুলের একজন শিক্ষক, আর তার ভাই খালিদ – যাকে নিরাপত্তা বাহিনী ২০১৩ সালে হত্যা করে – ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র।
ঐ গোষ্ঠীর বর্তমান নেতা জাকির রশীদ ভাট উত্তর ভারতীয় শহর চণ্ডীগড় থেকে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন।
তৃতীয়ত: কাশ্মীরের দুই বছর বয়সী জোট সরকার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারছে না। জোটটি হয়েছে এমন দুটো দলের মধ্যে যাদের একটি – পিডিপি – মসৃণ বিচ্ছিন্নতাবাদকে সমর্থন করে, আর অন্যটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী। তাদের রয়েছে ভিন্ন রকমের আদর্শ, কিন্তু কাজ করছে বিরোধপূর্ণ একটি এলাকায়।
চতুর্থত: কাশ্মীরের বিষয়ে সরকারের বার্তা উল্টো ফল দিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।
কিছুদিন আগে মোদী যখন বললেন যে কাশ্মীরি যুবকদেরকে হয় সন্ত্রাস নয়তো পর্যটনকে বেছে নিতে হবে, তখন অনেক কাশ্মীরি তাকে এই বলে অভিযুক্ত করেছেন যে তিনি তাদের দীর্ঘ সংগ্রামকে পাত্তা দিচ্ছেন না।
পঞ্চমত: কট্টর হিন্দু গোষ্ঠীগুলোর মুসলমান বিরোধী উগ্র বক্তব্য এবং ভারতের অন্যান্য এলাকায় মুসলিম গবাদি পশু ব্যবসায়ীদের ওপর তথাকথিত গো-রক্ষকদের হামলা উপত্যকার মানুষদের আরও বেশী ভিন্ন মেরুতে ঠেলে দিচ্ছে।
কাশ্মীর বিষয়ে পাঁচটি তথ্য:
১. ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর গত ৭০ বছর ধরে ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মীর নিয়ে বিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে
২. দুটো দেশই পুরো কাশ্মীরের মালিকানা দাবি করে, কিন্তু দখলে রেখেছে আংশিক ভূখণ্ড
৩. ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার তিনটি যুদ্ধের দুটোই হয়েছে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে
৪. ভারত শাসিত মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরে ১৯৯৮ সাল থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহ চলছে
৫. উঁচু বেকারত্ব ও রাস্তার বিক্ষোভ ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর আচরণ নিয়ে অভিযোগ সেখানে সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে
নিরাপত্তা বাহিনী অবশ্য বলেছে যে উপত্যকার তরুণরা “ধর্মীয় মৌলবাদ”-এর দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলে তারা উদ্বিগ্ন।
কাশ্মীরে একজন শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তা, লে. জেনারেল জেএস সাধু, একটি সংবাদপত্রকে বলেছেন যে উদ্বেগের বিষয়গুলো হলো “সন্ত্রাসীদের প্রতি জনসমর্থন, তাদের গুণকীর্তন এবং মৌলবাদের ক্রমশ: ঝুঁকে পড়া”।
একজন সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন ধর্মীয় চরমপন্থা “পাথর নিক্ষেপকারীদের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ”। তিনি বলেন, গত এক দশকে কাশ্মীরে সৌদি-অনুপ্রাণিত ওয়াহাবী মতাদর্শের প্রায় ৩,০০০ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *