টোল আদায়ের নামে চলছে ব্যাপক চাঁদাবাজি

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: রাজধানীর শনির আখড়া বাসস্ট্যান্ডসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিটি টোল আদায়ের নামে চলছে বেপরোয়াভাবে চাঁদাবাজি। স্থানীয় চাঁদাবাজরা বাস, ট্রাক, টেম্পু, সিএনজি ও প্রাইভেটকার থেকে ইচ্ছেমতো চাঁদা আদায় করছে। চাঁদাবাজদের অত্যাচারে গাড়িচালকরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। অভিযোগে জানা গেছে, শনির আখড়া বাসস্ট্যান্ডে বাস ৪শ থেকে ৫শ, টেম্পু ৫০ থেকে ১শ, ট্রাক ৬শ থেকে ৮শ, সিএনজি ২০ থেকে ৩০ এবং প্রাইভেটকার ১শ থেকে ২শ টাকা হারে সিটি টোল আদায় করছে। দাবিকৃত সিটি টোল না দিলে গাড়ি চাবি ছিনিয়ে নেয় স্থানীয় কতিপয় চাঁদাবাজ। গত ২৯ এপ্রিল রাত ১০টার দিকে স্থানীয় চাঁদাবাজরা ঠিকানা পরিবহণের চালক ও হেলপারকে মারধর করে সারাদিনের উপার্জনের টাকা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়। টেম্পু ও সিএনজির চালকদের তারা মারধর করে টাকা ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, মাওয়া সড়কে চলাচলকারী ইলিশ পরিবহণের নেতা আসাদুজ্জামান খোকন, জাকির, বাশার, আবুল কালাম, জীবন, শিফারি বাবু, কাজল ও পাপ্পুসহ অনেকই শনির আখড়া বাসস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি করছে। তারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ ব্যাপারে সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।

অপর একটি সূত্র জানায়, সন্ত্রাসীরা সরাসরি ‘চাঁদা’ তুললেও পরিবহণ শ্রমিকরা চাঁদা নেয় শ্রমিক কল্যাণের নামে। ট্রাফিক সার্জেন্টরা টাকা তোলে মাসোহারা হিসেবে। এছাড়া আছে রেকার ভাড়া, রাস্তা ক্লিয়ার ফি, ঘাট ও টার্মিনাল সিরিয়াল, পার্কিং ফি নামের অবৈধ চার্জ। এমন নানা নামে, নানা কায়দায় চলছে এ চাঁদাবাজির উৎসব। রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা।

সায়েদাবাদ-গাজীপুর রুটে চলাচলকারী একাধিক মিনিবাস চালক বলেন, নানামুখী চান্দা-ধান্ধার কবলে চালক, মালিক, শ্রমিক সবার জীবনই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। যাত্রীরা হচ্ছেন নানা দুর্ভোগের শিকার। মহাখালী, গাবতলী, সায়েদাবাদসহ সব বাস-ট্রাক টার্মিনালের অবস্থাই অভিন্ন। এসব স্থানে গাড়ি ঢুকতেও টাকা লাগে, বেরোতেও লাগে টাকা। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে পুলিশের চাঁদাবাজি। রাজধানীসহ সারাদেশের সড়ক-মহাসড়কের যত্রতত্র পুলিশের বিশেষ চেকিং আর মাসোহারা আদায়ের প্রতিযোগিতা বন্ধের সাধ্য যেন কারও নেই। রাজধানীর একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে ট্রাকপ্রতি ৫শ-৬শ টাকা গুনতে হয়। ট্রাকচালকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আগে সাধারণত ঢাকার যেকোনো ১ জন সার্জেন্টকে ১শ টাকা দিয়ে সস্নিপ সংগ্রহ করলে সিটির মধ্যে আর কোথাও পুলিশকে চাঁদা দিতে হতো না। কিন্তু বর্তমানে ১ সার্জেন্ট অন্য সার্জেন্টের সস্নিপকে পাত্তা দেয় না, আলাদা আলাদাভাবেই টাকা দিতে হয়।

সূত্র জানায়, থানার চাঁদা, ফাঁড়ির চাঁদা, বোবা চাঁদা, ঘাট চাঁদা, স্পট চাঁদা, পুলিশের মাসোহারা, মালিক-শ্রমিকের কল্যাণ ফি, রুট কমিটি-টার্মিনাল কমিটির চাঁদাও চলে বাধাহীনভাবে। সবকিছুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে পুলিশের টোকেন বাণিজ্য। বাণিজ্যিক পরিবহণে নানা নামে, নানা ঢঙে চাঁদাবাজি চলে। টার্মিনাল-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সায়েদাবাদ থেকে দেশের পূর্ব-উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাসমূহের ৪৭টি রুটে চলাচলরত ২ সহস্রাধিক যানবাহন থেকে প্রতিদিন ফ্রি স্টাইলে চলছে চাঁদাবাজি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুরসহ ৩২টি রুটে প্রতিদিন ১ হাজার ২শ কোচ চলে। এছাড়া রাজধানীর গাবতলী টার্মিনাল, মহাখালী, উত্তরা, গাজীপুর, টঙ্গী, কালীগঞ্জ, শ্রীপুর, কাপাসিয়াসহ শহর ও শহরতলীর অন্যান্য রুটে সহস্রাধিক বাস-মিনিবাসের চলাচল রয়েছে। বাস-মিনিবাসের চালক ও শ্রমিকরা জানান, চাঁদা না দিয়ে কোনো গাড়ি টার্মিনাল থেকে বাইরে বের করার সাধ্য কারও নেই। চাঁদা নিয়ে টুঁশব্দ করলে নির্যাতনসহ টার্মিনাল ছাড়া হতে হয়। রাজধানী থেকে চলাচলকারী দূরপাল্লার কোচ থেকে ১২শ টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজি চলছে এবং লোকাল সার্ভিসের প্রতিটি গাড়ি থেকে ট্রিপে আদায় করা হচ্ছে ৫শ থেকে ৭শ টাকা। বিভিন্ন রুটে চলাচলরত গাড়ির মালিক-শ্রমিকরা জানান, নানা রকম কমিটির দখলদারিত্ব আর মাত্রাতিরিক্ত চাঁদাবাজির অত্যাচারে মালিকরা পথে বসতে চলেছেন। শ্রমিকদের আয়ও কমে গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ১ জন বাস মালিক বলেন, লাকসাম, কিশোরগঞ্জ, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন রুটে এখন গাড়িপ্রতি ১২৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হচ্ছে। চাঁদাবাজির শিকার পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকরা প্রতিদিন চাঁদা প্রদানের বিস্তারিত তালিকা তুলে জানান, পরিবহণ-সংশ্লিষ্ট একটি কেন্দ্রীয় ফেডারেশনের নামে ৫০ টাকা, মালিক সমিতি ৮০ টাকা, শ্রমিক ইউনিয়ন ৪০ টাকা, টার্মিনাল কমিটি ২০ টাকা, কলার বয় ব্যবহার বাবদ ২০ টাকা, কেরানির ভাতা ২০ টাকা, মালিক-শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের নামে ৫০ টাকা এবং ১টি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় ২ প্রভাবশালী নেতার নামে ৫০ টাকা করে চাঁদা নেয়া হচ্ছে।

পরিবহণ মালিকরা অভিযোগ করেন- যমুনা সেতুর ২ প্রান্তে ও গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জে সরকারি দলের নেতা-পাতি নেতা, কর্মী-ক্যাডার নামধারী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও পুলিশের অসাধু সদস্যরা চাঁদাবাজি করে আসছে। রাজশাহী থেকে একটি যাত্রীবাহী বাস ঢাকায় আসতে প্রতি ট্রিপে দেড়-দুই হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। যেসব জেলা পেরিয়ে আসতে হয়, সেসব জেলায় মাসিক ভিত্তিতে পুলিশ সার্জেন্টদের ৫শ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। এর বাইরে থানা-ফাঁড়ির পুলিশদেরও নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। এছাড়াও ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন শ্রমিক ও মালিক সংগঠন-সমিতিকেও পয়েন্টে পয়েন্টে চাঁদা দিয়ে পরিবহণ ব্যবস্থা চালু রাখতে হয়। সড়ক-মহাসড়কে বেপরোয়া চাঁদাবাজি শুধু রাজশাহী অঞ্চলেই নয়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সমানভাবে চলছে। ঢাকার সায়েদাবাদ নতুন রাস্তা, মাওয়াঘাট, ভাঙ্গায় পুলিশ সার্জেন্টদের নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদার টাকা দিতে হয়। মাসিক চাঁদার টাকা না দিলে নানা সাজানো মামলাসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়।

এছাড়াও দেশের বিভিন্ন পৌরসভার প্রবেশ পথে পণ্য পরিবহণে বেপরোয়া চাঁদাবাজি চলছে। বাঁশকল কিংবা টোলঘর বসিয়ে আদায় করা হচ্ছে এ চাঁদা। মন্ত্রণালয় থেকে বারবার নির্দেশনা দেয়ার পরও তা থামছে না। যেসব পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব ট্রাক টার্মিনাল রয়েছে, সেগুলোতে টার্মিনাল টোল আদায়ের বিধান রয়েছে। যেখানে টার্মিনাল নেই সেখানে টোলের নামে চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ অবৈধ। কিন্তু বেশকিছু পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনে বাঁশকল ও টোলঘর বসিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদা তোলা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে- নরসিংদীর মাধবদীতে ৫০ টাকা, রংপুর বাইপাসে ৫০ টাকা, ঝিনাইদহ পুলিশ লাইনের কাছে ৩০ টাকা, বাগেরহাট বড় বাজারের সামনে ৬০ টাকা, মাদারীপুর শহরের প্রবেশপথে ৮০ টাকা, রাজৈর পৌরসভার নামে টেকেরহাটে ৬০ টাকা, গোপালগঞ্জ পুলিশ লাইনের পাশে রাস্তার ওপর টোলঘর বসিয়ে ৫০ টাকা ও যশোরে গাড়িপ্রতি ২০ টাকা হারে চাঁদাবাজি চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *