কাস্টমস হাউস ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার দাবি

শামীম চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে গতি আনতে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার জন্য আবারও দাবি জানালেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা।একইসঙ্গে সব ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্য বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।এছাড়া হয়রানি বন্ধে অনলাইনে ইমপোর্ট জেনারেল মেনিফেস্ট-আইজিএম সংশোধনী গ্রহণের পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস আয়োজিত গণশুনানি অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীরা এসব দাবি জানান।তারা বলেন, উত্থাপিত দাবি বাস্তবায়ন করা না হলে চট্টগ্রাম কাস্টমস কেবল টার্গেট নিয়েই দৌড়াবে, কিন্তু তাতে কখনো সফল হওয়া যাবে না।
কাস্টমস কমিশনার এএফএম আবদুল্লাহ খান ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন অভাব-অভিযোগের বিষয় মনোযোগ দিয়ে শুনলেও তার একার পক্ষে এসব দাবি পূরণ করা সম্ভব নয় বলে জানান।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক দাবির বিষয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরের কাছে তিনি উপস্থাপন করবেন। এসব দাবি আদায় ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করবেন।চট্টগ্রাম কাস্টমসের তিনতলার অডিটোরিয়ামে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
সূত্র জানায়, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গণশুনানি করলেও সরকারের নির্দেশে কাস্টমস হাউস নিজেরাই এ গণশুনানির আয়োজন করে। ব্যবসায়ীরা দুই মাস পর পর এ ধরনের গণশুনানি আয়োজনের অনুরোধ করেন।
গণশুনানিতে চট্টগ্রাম চেম্বার প্রতিনিধি হিসেবে পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম আকতার হোসেন, বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক (বন্দর ও কাস্টমস) খায়রুল আলম সুজন, বিজিএমইএ পরিচালক কাজী মাহবুব জুয়েলসহ বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন। এতে কাস্টমস কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার, সহকারী কমিশনারসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।মাহফুজুল হক শুনানিতে বলেন, ৫০ বছরের পুরনো জনবল কাঠামোতে চলছে কাস্টমস হাউস। অথচ এরই মধ্যে কাস্টস হাউসের কাজের পরিধি বহুগুণে বেড়েছে। কিন্তু লোকবল সংকটের কারণে কাজের গতি বাড়েনি।
তিনি অভিযোগ করেন, পদ্ধতিগত নানা জটিলতা ও লোকবল সংকটকে পুঁজি করে একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ ব্যবসায়ী ও তাদের প্রতিনিধিদের নানাভাবে হয়রানি করছেন। অন্যায় দাবি পূরণ করা না হলে পণ্যচালান আটকে রাখছেন।
আবার তাদের সঙ্গে ভিড়ে অনেক অসাধু আমদানিকারক ঘুষ-উৎকোচের বিনিময়ে একপণ্যের আড়ালে আরেক পণ্য ছাড় করে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, বলেন চট্টগ্রাম চেম্বার প্রতিনিধি।তিনি অভিযোগ করেন, দেশ ও জনগণের কল্যাণে যারা শিল্পায়ন করছেন, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছেন, সেসব আমদানিকারক ও শিল্প মালিকরা কাস্টমস হাউসের অযাচিত নানা হস্তক্ষেপে হয়রানি ও লোকসানের মুখোমুখি হচ্ছেন। যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন না করার কারণে এই হয়রানির মাত্রা পদে পদে বাড়ছে।
মাহফুজুল হক বলেন, কাজের গতি বাড়ানো ও হয়রানি বন্ধে কাস্টমস হাউস বন্দরের মতো ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। বাণিজ্যমন্ত্রীও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের এই মর্মবেদনা বুঝেছেন। তিনি নিজেও কাস্টমস হাউস ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার জন্য এনবিআরকে অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।তিনি বলেন, ৯০ শতাংশ আমদানি-রফতানি বাণিজ্য হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কাস্টমস দিয়ে। এবার ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের টার্গেট ধরা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের গলা কেটে কেবল কাস্টমস টার্গেটের পেছনে দৌড়াচ্ছে। বিপরীতে তাদের (ব্যবসায়ীদের) সেভাবে সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে না। এরকম হলে টার্গেট কখনোই অর্জন হবে না।
চট্টগ্রাম চেম্বার প্রতিনিধি বলেন, চট্টগ্রামে যে ল্যাবরেটরি আছে সেটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তাই অনেক আমদানি পণ্যের ল্যাবরেটরি টেস্টের জন্য ঢাকায় দৌড়াতে হয়। হয়রানির শিকার হতে হয়, অর্থ অপচয় হয়।
তিনি বলেন, আমদানি পণ্যের শুল্কায়নের ফাইল চালাচালিতে অস্বাভাবিক দীর্ঘসূত্রিতা ব্যবসায়ীদের কোমর ভেঙে দিচ্ছে। বন্দরে কনটেইনার জট ও জাহাজ জট লেগে থাকছে। যেন কোনো জবাবদিহিতাই নেই। এটা চলতে দেয়া যায় না।
মাহফুজুল হক বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে সরকার দেশকে মধ্য-আয়ের দেশে উন্নীত করার যে লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তা বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম কাস্টমসকে দুর্নীতি ও হয়রানি মুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই।
বন্দর-কাস্টমসের মধ্যে কো-অর্ডিনেশন সেল গঠন করে দুই সংস্থার কাজে সমন্বয় সাধন করেই আমদানি-রফতানি কার্যক্রম আরও বেগবান করতে হবে বলেও মত দেন তিনি।
গণশুনানিতে খাইরুল আলম সুজন বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন আইজিএম দাখিলের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভুল হলে যাতে অনলাইনে সংশোধনী নেয়া হয়। কিন্তু তাদের সে দাবির প্রতি কাস্টমস ভ্রুক্ষেপ করে না।
এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে গতি আনতে কাস্টমসে সংস্কার, দুর্নীতি বন্ধ করা, ল্যাবরেটরি স্বয়ংসম্পূর্ণ করা, বন্দরকেন্দ্রিক যানজট নিরসনে অফডক বা বেসরকারি পোর্টগুলো শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন প্রস্তাবনা দিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু কোনো প্রস্তাবনাই আলোর মুখ দেখছে না বলে শুনানিতে স্পষ্ট করে বলেন তিনি।
গণশুনানি প্রসঙ্গে খাইরুল আলম সুজন বৃহস্পতিবার বিকালে বলেন, ‘সরকারের নির্দেশে কাস্টমস কর্তৃপক্ষই এ গণশুনানির আয়োজন করে। স্টেকহোল্ডাররা তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। কাস্টমসে হয়রানির কথা তুলে ধরেছেন। কাস্টমস কমিশনারও আমাদের কথা মনযোগ দিয়ে শুনেছেন। আমরা মন খুলে কথা বলেছি, এই যা। আমাদের যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবি-দাওয়াগুলো এনবিআরের কাছে পৌঁছাবেন বলে জানিয়েছেন কমিশনার।’
রাজস্ব প্রশাসনে অধিকতর গতিশীলতা আনয়ন এবং করদাতা বান্ধব রাজস্ব পরিবেশ সৃজনের অনুসৃত ‘সুশাসন ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো’ এর আওতায় কাস্টমসে অধিকতর স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ গণশুনানির আয়োজন করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *