মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ : স্মৃতিসৌধের স্থাপত্য ও তাৎপর্য

এম.সোহেল রানা: মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ মেহেরপুর জেলার ততকালিন নাম বোদ্ধনাথ তলা আম্রকানন তথা বর্তমান নাম মুজিবনগরে অবস্থিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠণ ও অস্থায়ী সরকারের শপথ বাক্য পাঠ করানো হয়, আর সেখানেই এই স্মৃতিসৌধটি গড়ে তোলা হয়েছে। মুজিবনগর মেহেরপুর সদর থেকে ১৫ কিঃমিঃ দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। স্বাধীনতার পর থেকে ১৭ই এপ্রিল সরকারি ছুটি মুজিবনগর দিবস পালন করা হয়ে আসছে। ঐ দিন মাননীয় সরকারের মন্ত্রী পরিষদের বিভিন্ন পর্যায়ের এমপি,মন্ত্রী মহোদ্বয়রা এসে বিশাল জনসভা করে শ্রদ্ধার সহিত দিনটি পালন করে থাকেন। এ অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন করতে মেহেরপুর জেলা প্রশাসক অগ্রনী ভূমিকা পালন করে থাকেন।

স্মৃতিসৌধের স্থাপত্য ও তাৎপর্যঃ-
পূর্বের নাম বোদ্ধনাথ তলা আম্রকানন তথা বর্তমান নাম মুজিবনগর।
এই মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের স্থপতি হলেন- জনাব,তানভীর কবির।
লাল মঞ্চ-
১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার যে স্থানে শপথ গ্রহণ করে ঠিক সেই স্থানে ২৪ ফুট দীর্ঘ ও ১৪ ফুট প্রশস্থ সিরামিকের ইট দিয়ে একটি আয়তকার লাল মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। যা মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের ভিতেরে মাঝখানে।

২৩টি স্মৃতি স্তম্ভ-
স্মৃতিসৌধটি ২৩ টি ত্রিভূজাকৃতি দেয়ালের সমন্বয়ে গঠিত। যা বৃত্তাকার উপায়ে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে। ২৩ টি দেয়াল [আগষ্ট ১৯৪৭] থেকে [র্মাচ ১৯৭১]- এই ২৩ বছরের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথম দেয়ালটির উচ্চতা ৯ ফুট ৯ ইঞ্চি এবং দৈর্ঘ্য ২০ ফুট। পরবর্তী প্রতিটি দেয়ালকে ক্রমান্বয়ে দৈর্ঘ্য ১ ফুট ও উচ্চতা ৯ ইঞ্চি করে বাড়ানো হয়েছে। যা দ্বারা বুঝানো হয়েছে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার জন্য ৯ মাস ধরে যুদ্ধ করেছিল। শেষ দেয়ালের উচ্চতা ২৫ ফুট ৬ ইঞ্চি ও দৈর্ঘ্য ৪২ ফুট। প্রতিটি দেয়ালের ফাঁকে অসংখ্য ছিদ্র আছে যেগুলোকে পাকিস্থানি শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচারের চিহ্ন হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে।

এক লক্ষ বুদ্ধিজীবির খুলি
স্মৃতিসৌধটির ভূমি থেকে ২ ফুট ৬ ইঞ্চি উঁচু বেদীতে অসংখ্য গোলাকার বৃত্ত রয়েছে যা দ্বারা ১ লক্ষ বুদ্ধিজীবির খুলিকে বোঝানো হয়েছে।

ত্রিশ লক্ষ শহীদ
স্মৃতিসৌধের ভূমি থেকে ৩ ফুট উচ্চতার বেদীতে অসংখ্য পাথর রয়েছে যা দ্বারা ৩০ লক্ষ শহীদ ও মা-বোনের সম্মানের প্রতি ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ও স্মৃতিচারণা প্রকাশ করা হয়েছে। পাথরগুলো মাঝখানে ১৯টি রেখা দ্বারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের ১৯টি জেলাকে বুঝানো হয়েছে।

এগারোটি সিঁড়ি
স্মৃতিসৌধের বেদীতে আরোহণের জন্য ১১টি সিঁড়ি রয়েছে। যা দ্বারা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সমগ্র বাংলাদেশকে যে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়েছিল তা বুঝানো হয়েছে।

বঙ্গোপসাগর
স্মৃতিসৌধের উত্তর পাশের আম বাগান ঘেঁষা স্থানটিতে মোজাইক করা আছে তার দ্বারা বঙ্গোপসাগর বোঝানো হয়েছে। বঙ্গোপসাগর যদিও বাংলাদেশের দক্ষিণে, কিন্তু শপথ গ্রহণের মঞ্চটির সাথে স্মৃতিসৌধের সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য এখানে এটিকে উত্তর দিকে স্থান দেয়া হয়েছে।

একুশে ফেব্রুয়ারির প্রতীক
স্মৃতিসৌধের মূল ফটকের রাস্তাটি মূল স্মৃতিসৌধের রক্তের সাগর নামক ঢালকে স্পর্শ করেছে। এখানে রাস্তাটি ভাষা আন্দোলনের প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

রক্তের সাগর
স্মৃতিসৌধের পশ্চিম পাশে প্রথম দেয়ালের পাশ দিয়ে শহীদের রক্তের প্রবাহ তৈরি করা হয়েছে যাকে রক্তের সাগর বলা হয়।

সাড়ে সাত কোটি ঐক্যবদ্ধ জনতা
লাল মঞ্চ থেকে যে ২৩টি দেয়াল তৈরি করা হয়েছে তার ফাঁকে অসংখ্য নুরি-পাথর দ্বারা মোজাইক করে লাগানো হয়েছে। যা দিয়ে ১৯৭১ সালের সাড়ে সাত কোটি ঐক্যবদ্ধ জনতাকে প্রতীক আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। (তথ্য সংগ্রহ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *