অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনায় হুমকিতে জাতীয় গ্রিড

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিড ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে ব্যবস্থাপনা সঠিক না হওয়ায় জাতীয় গ্রিডের কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে গোটা দেশ দুর্ভোগে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় গ্রিড। বর্তমানে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব রয়েছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ওপর। সংস্থাটির ২৩০ ও ১৩২ কিলো ভোল্টেজ ক্ষমতার সাড়ে ৯ হাজার সার্কিট কিলোমিটারের সঞ্চালন লাইন সারাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে আছে। তাছাড়া উপকেন্দ্র রয়েছে ১৬০টিরও বেশি। কিন্তু অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে ওই সঞ্চালন লাইন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলে সারাদেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে। তা ঠেকানোর সুযোগ থাকলেও গ্রিডের সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে না পারায় তাতে ব্যর্থ হচ্ছে পিজিসিবি। বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চলতি বছরের ১ মে রাতে কালবৈশাখীর আঘাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কালীপুরে একটি বিদ্যুতের টাওয়ার ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২৩০ কিলোভোল্ট ক্ষমতার আশুগঞ্জ-সিরাজগঞ্জ সঞ্চালন লাইন। ওইদিন রাতেই ওই গ্রিড-সম্পৃক্ত জেলায় শুরু হয় লোডশেডিং। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প লাইন হিসেবে ঘোড়াশাল-ঈশ্বরদী লাইন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ভারত থেকে আসা বিদ্যুৎ ও ওই অঞ্চলের বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের চাপ সামলাতে না পেরে পরদিন সকালে ওই লাইনটিও ট্রিপ (ধাক্কা খেয়ে সরবরাহ বন্ধ) করে। ফলে পুরোপুরি বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর অঞ্চলের জেলাগুলো। অথচ গ্রিড কোড অনুযায়ী আশুগঞ্জ-সিরাজগঞ্জ লাইনটি বিকল হওয়ার পর সরবরাহযোগ্য এলাকার চাহিদা অনুযায়ী ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনা বন্ধ রাখা অথবা খুলনা অঞ্চলের অন্যান্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দ্বিতীয় লাইনটি সংরক্ষণের দায়িত্ব পিজিসিবির। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে এক সাথে দুটি লাইনই বিকল হয়ে পড়ে। তার জের ধরে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় স্বল্প পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। পাশাপাশি বিকল হওয়া লাইনের মেরামত কাজও অব্যাহত রয়েছে। টাওয়ার পুনঃস্থাপনসহ নির্মাণকাজ শেষ হতে আরো কয়েক মাসের সময় লাগবে বলে জানা যায়। এমন পরিস্থিতি এড়ানোর সুযোগ থাকলেও তাতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে পিজিসিবি। জাতীয় গ্রিডের অভিন্ন সঞ্চালন লাইনটির একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে যাতে সারাদেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় প্রভাব না পড়ে সেজন্য স্কাডাসহ নানা পদ্ধতি রয়েছে। ওসব পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে প্রতিবেশী ভারতসহ অন্যান্য দেশ তাদের জাতীয় গ্রিড সফলভাবে ব্যবস্থাপনা করছে। অথচ মে মাসে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় গোটা দক্ষিণাঞ্চলে প্রভাবের বিষয়টিকেও ঠেকানোর সুযোগ ছিল। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনা বন্ধ রাখা বা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের সঞ্চালন লাইনটি রক্ষা করতে পারতো পিজিসিবি। কিন্তু তা না করায় পাওয়ার ট্রিপের ফাঁদে পড়ে ওই অঞ্চলের কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যন্ত্র নষ্ট হয়ে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সারাদেশে তীব্র লোডশেডিংয়ের সৃষ্টি হয়, যা এখনো বিদ্যমান রয়েছে। ওই কারণে রমজানের মধ্যেও গ্রাহকদের লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বিগত ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে এক দুর্ঘটনার কারণে সারাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। তখন গোটা দেশ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল প্রায় ২০-২২ ঘণ্টা। গ্রিড ব্যবস্থাপনার কোড অনুযায়ী সঞ্চালন ব্যবস্থার এমন বিপর্যয় খুলনা তথা দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল। কিন্তু জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা পিজিসিবি তাতে ব্যর্থ হয়। ওই সময় সারাদেশে প্রায় একদিনের জন্য কল-কারখানার উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম থমকে যায়। দুর্ভোগে পড়ে গোটা দেশ ভারতসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশ স্কাডা পদ্ধতিসহ অন্যান্য কারিগরি উপায়ে নিজেদের জাতীয় গ্রিড সংরক্ষণ করতে পারলেও বাংলাদেশ সেখানে ব্যর্থ হচ্ছে। মাত্র সাড়ে ৯ হাজার সার্কিট কিলোমিটারের সঞ্চালন লাইনের ব্যবস্থাপনা সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে পিজিসিবি। ২০১৪ সালের বস্ন্যাক আউটের পর গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির সুপারিশে অঞ্চলভিত্তিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা ও স্কাডা সিস্টেমের মাধ্যমে সঞ্চালন লাইন পরিচালনার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেক্ষেত্রে কোনো দক্ষতার ছাপ দেখাতে পারছে না সঞ্চালন বিভাগ। পিজিসিবির এমন অদক্ষতায় নাখোশ স্বয়ং বিদ্যুৎ বিভাগও। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পিজিসিবির কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির তাগিদ দেয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুম-আল-বেরুনী জানান, গ্রিড সিস্টেম পৃথিবীর প্রায় সব দেশে একই। তবে ২০১৪ সালের পর যেসব বিষয়ে উন্নতি করার প্রয়োজনীয়তা খুঁজে পাওয়া গেছে সেসব ক্ষেত্রে কাজ করা হচ্ছে। গ্রিডের একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সারাদেশে যাতে তার প্রভাব না পড়ে তা নিশ্চিত করতে এখন স্কাডা কার্যকর করাসহ অন্যান্য কারিগরি বিষয়গুলোর প্রতি জোর দেয়া হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *