অর্থমন্ত্রীর তুঘলকী সিদ্ধান্ত: আলোচনায় ব্যাংক আমানতের ওপর শুল্ক

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা : প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপনের আগে আলোচনায় ছিল ভ্যাট। তবে গত বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী সংসদে বাজেট পেশের পর আলোচনার তুঙ্গে এখন ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক। আর গতকাল রোববার বাজেট ঘোষণার পর প্রথম কর্মদিবসে ব্যাংকপাড়ায় আলোচনার শীর্ষে ছিল ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক। এবারের বাজেটে এখন থেকে যারা ব্যাংকে কমপক্ষে ১ লাখ টাকা রাখবেন, বছর শেষে তাদের আবগারি শুল্ক গুণতে হবে। আবগারি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ১ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত কেউ ব্যাংকে রাখলে তাকে আবগারি শুল্ক দিতে হবে ৮শ টাকা, ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত কেউ আমানত রাখলে তাকে আবগারি শুল্ক আরোপ করা হবে ২ হাজার ৫শ টাকা, ১ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা অ্যাকাউন্টে রাখলে তার ওপর আবগারি শুল্ক আরোপ করা হবে ১২ হাজার টাকা। এছাড়া ব্যাংকে ৫ কোটি টাকার ওপরে রাখলে তাতে আবগারি শুল্ক আরোপ করা হবে ২৫ হাজার টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী-বর্তমানে ব্যাংকগুলোর আমানতের গড় সুদ ৫ দশমিক ১ শতাংশের মধ্যে। এদিকে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ। এখন ব্যাংকে ১ লাখ টাকা আমানত থাকলে বছর শেষে যে ৫ হাজার টাকা পাওয়া যাবে তার মধ্যে উৎসে কর আবগারি শুল্ক ও মূল্যস্ফীতি বাবদ কেটে রাখার পর মূল মূলধনই কমে যাবে আমানতকারীর।
এ নিয়ে ব্যাংক গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ সবকিছু বাদ দিয়ে এখন এই বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করছেন, কথা বলছেন। কেউ কেউ বলছেন, আমাদের বোধহয় এখন আবার মাটির ব্যাংকের যুগে ফিরে যেতে হবে।
পুরনো ঢাকার গৃহিণী কবিতা আক্তার বলেন, আমরা অনেক কষ্ট করে ব্যাংকে টাকা জমাই। মায়ের কাছ থেকে নিই। স্বামীর কাছ থেকে নিই। টুকটাক কাজ করেও টাকা জমাই। পরিবারের বিপদে, ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া, চিকিৎসার কাজে লাগে। এখন এই টাকাও কেটে নেবে। এটা কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না। এটা অর্থমন্ত্রীর একটা তুঘলকী সিদ্ধান্ত।
অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদও এর বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ১ লাখ টাকার সিলিংটা ঠিক নয়। সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষও তার বিপদের সময়ের জন্য ১ লাখ টাকা ব্যাংকে রাখেন। এটা অনেক বেশি টাকার জন্য হতে পারে। কারণ তারা বিনিয়োগ করতে পারেন অন্য খাতে। এদিকে সিপিডি মনে করে, এই বাজেটের ফলে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়বে। মূল্যস্ফীতি বাড়বে। সিপিডি’র ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য গত শুক্রবার দুপুরে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, বাজেটে যে কর ও ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, তাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, বাড়বে ভোগ ব্যয়, এর ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। এতে নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন।
তার মতে, সামগ্রিকভাবে বাজেটে যে আয় ও ব্যয় ধরা হয়েছে-তা বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই? শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়ন করা যাবে না। বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়ন করার একটা রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে। সেটা হলো- জাতীয় সংসদের প্রতিনিধি ছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত করা, কিন্তু বাস্তবে আমরা বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা দেখি না। আর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত গত শুক্রবার বিকেলে বাজেট পরবর্তী সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ১৫ শতাংশ ভ্যাট কার্যকর করা হলেও জিনিসপত্রের দাম বাড়বে না। কারণ অনেক পণ্যে ভ্যাট ছাড় দেয়া হয়েছে। আর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ভ্যাট বাড়লে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য হবে না।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, নতুন বাজেটে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় বেশি রেখেছি। পাইপ লাইনেও অনেক বেশি টাকা আছে। আমরা এই টাকার সদ্ব্যবহার করতে পারি না। টোটাল টাকা ব্যবহার করতে পারছি না। এরপরেও বিদেশি সাহায্যের পরিমাণ বেশি রেখেছি। কারণ এর মধ্য দিয়েই এই টাকা ব্যবহারের সক্ষমতা আমরা অর্জন করবো।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উত্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এটা মোট জিডিপি’র ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)’র পরিমাণ ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা। এবারের বাজেটে রাজস্ব আহরণের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর খাতে আসবে ২ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরবহির্ভূত আয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৬শ ২২ কোটি টাকা। কর ছাড়া আয় ধরা হয়েছে ৩১ হাজার ১শ ৭৯ কোটি টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *