একাদশ নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছে আ’লীগ

টাইমস আই বেঙ্গলী ডকটম, ঢাকা: আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনশ আসনে সাড়ে ৩ হাজারেরও অধিক প্রার্থী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। আগ্রহীদের মধ্যে রয়েছে চার শতাধিক শিক্ষিত তরুণ। তাদের অর্ধেকই মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। এছাড়াও একাদশ নির্বাচনে নৌকার মাঝি হতে ইতিমধ্যেই জনসংযোগ শুরু করেছেন সরকারের সাবেক আমলারাও। তবে ২০১৯ সালে অনুষ্ঠেয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আরেকটি ৭০-এর (১৯৭০) নির্বাচন বলে মনে করছেন সরকারি দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। তাদের মতে, কেবল আওয়ামী লীগ নয়, স্বাধীনতার পক্ষশক্তির জন্য এই নির্বাচন একটি চ্যালেঞ্জের। শুধু তাই নয়, সাধারণ মানুষের মন জয় করতে কেন্দ্র থেকে একেবারে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত চলছে নির্বাচনী মহড়া।
সূত্রমতে, রাজনীতির ময়দানে এখনই শুরু হয়েছে নির্বাচনী ডামাডোল। সাধারণ মানুষও নির্বাচনের হিসাব কষতে শুরু করেছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেনি বিধায় আগামী নির্বাচন ঘিরে মানুষের মধ্যে আলাদা এক উৎফুল্লতা বিরাজ করছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বর্তমান মাঠের বিরোধী দল বিএনপি’র অতীত এবং বর্তমান কর্মকা-ের নানা দিক ওঠে আসছে মানুষের কথোপকথনে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় আগামী নির্বাচন সবার কাছেই অতি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ ভোটাররা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, পছন্দের শীর্ষে থাকা নৌকা কিংবা ধানের শীষ-জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলের প্রতীকে সিল মেরে নিজেদের সুস্থ চিন্তার বাস্তবায়ন ঘটানোর।
জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার জনপ্রিয় প্রার্থীদের মনোনয়ন দেবে ১৪দলীয় জোটের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। আর জনপ্রিয় প্রার্থী বাছাই করতে ৩ স্তরের সাংগঠনিক জরিপ চলছে। এ ছাড়া দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে একাধিক গোয়েন্দা জরিপও চলছে। সমপ্রতি সাংগঠনিক এক জরিপ রিপোর্টে উঠে এসেছে, ‘৩শ’ আসনের প্রতিটিতে গড়ে ১২ জন করে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী। তারা ইতোমধ্যে আট-ঘাট বেঁধে মাঠে নেমে পড়েছেন এবং নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় শুরু করেছেন জনসংযোগ। মনোনয়ন প্রত্যাশী ও বর্তমান এমপিদের মধ্যে অনেকটা ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়েছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ঘায়েল করতে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন মিথ্যা মামলা দিচ্ছে। এতে সম্ভাব্য অনেক এমপি প্রার্থী এখন এলাকা ছাড়া।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে না। এ কারণে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আগামী নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন দলের হাইকমান্ড। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই দলের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছেন। জনগণের মন জয় করতে মাঠে নামার জন্য এক বছর আগেই এমপিদের মাঠে নামার নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। গত ৭ মে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কঠিন চ্যালেঞ্জের। নিজেকে দায়িত্ব নিয়ে জনগণের ভোটে জিতে আসতে হবে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আরও বলেন, আমার কাছে নিয়মিত জরিপ প্রতিবেদন আসছে। এলাকায় কার কী অবস্থা জানি। যার প্রতিবেদন খারাপ, যারা এলাকায় দলাদলি করছেন, দলে বিভক্তি তৈরি করছেন, তাদের মনোনয়ন দেয়া হবে না। যারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জোয়ারে এমপি হয়েছেন, তারা জানেন না, নির্বাচন কত কঠিন। যারা এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের কর্মীদের নিয়ে চলেন, জনসম্পৃক্ততাহীন হয়ে পড়েছেন, ত্যাগী কর্মীদের থেকে দূরে সরে গেছেন, তারা মনোনয়ন পাবেন না।
দলীয় সূত্র জানায়, অনেক এমপির কার্যক্রম নিয়ে দলের ভিতরে বাইরে প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানের অনেক এমপি নেতাকর্মী বিচ্ছিন্ন। দলকে পরিণত করেছেন ‘ব্যক্তিলীগে’। দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতারা ভিড়তে পারেন না তাদের কাছে। এসব এমপির কাছে হাইব্রিডদের কদর সর্বাগ্রে। কেউ কেউ আবার দলীয় নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে ছেলেমেয়ে ও বউয়ের আত্মীয়-স্বজন দিয়ে দল পরিচালনা করছেন এলাকায়। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক জরিপে উঠে এসেছে, এবার এমপি হতে চান। এরমধ্যে উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারাও রয়েছেন। আবার কেউ কেউ রাজনীতিতে পা দিয়েই এমপি হওয়ার টার্গেট নিয়ে মাঠে নেমেছেন। সাবেক বা বর্তমান মন্ত্রী-এমপির সাথে টেক্কা দিয়ে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে দেশজুড়ে রাস্তায় রাস্তায়, নগর-শহর থেকে গ্রামীণ জনপদেও টানানো হচ্ছে তাদের নামে ডিজিটাল ব্যানার ও রঙিন পোস্টার। প্রচারণা চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন মাধ্যমেও। অযোগ্যদের ভিড়ে যোগ্য নেতারাও এখন কোণঠাসা। এদিকে বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে এটা ধরে নিয়েই দলকে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এর আগে ছয় মাস পরপর সংসদ সদস্যদের অবস্থা এবং দুর্বল আসনগুলোতে বিকল্প কী হতে পারে, তা দেখার জন্য জরিপ করিয়েছেন। এখন ৩ মাস পরপর এ জরিপ করানো হচ্ছে। সামপ্রতিক জরিপগুলোতে মাঠপর্যায়ে দলের কোন্দল এবং সংসদ সদস্যদের সাথে জনমানুষের দূরত্বের বিষয়টি ওঠে এসেছে।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের একজন সভাপতিম-লীর সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দলের প্রতি অনুগত, ‘গুড ইমেজ’ ও দুর্নীতিমুক্ত জনপ্রিয় প্রার্থীদের মনোনয়ন দেবে আওয়ামী লীগ। দলের সাংগঠনিক রিপোর্ট, সরকারি-বেসরকারি জরিপেও গুরুত্ব পাচ্ছে এগুলো। ইতিমধ্যে দলটির সাংগঠনিক সম্পাদকরা জেলায় জেলায় সফর করে নানা বিষয় তুলে আনছেন। নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে বর্তমান এমপিদের অবস্থান উঠে আসছে সাংগঠনিক প্রতিবেদনে। পাশাপাশি এমপিদের বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থাকেও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বর্তমান এমপি ছাড়াও সম্ভাব্য যোগ্য প্রার্থীদের প্রসঙ্গেও তৈরি হচ্ছে এসব প্রতিবেদন।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দেশবাসী স্বাধীনতার পক্ষশক্তির সাথে থাকবে, নাকি বিরোধী শক্তির সাথে থাকবে, সেই ফয়সালা হবে। তবে এ নির্বাচনে দেশবাসী স্বাধীনতার পক্ষশক্তির সাথেই থাকবে। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের জন্য জনগণ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকেই বেছে নেবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেখ হাসিনা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তৃৃণমূল সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেবে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি। দলের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, আগামী নির্বাচন আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা এ চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে চাই। দল অবশ্যই সৎ, যোগ্য, কর্মীবান্ধব, দুর্নীতিমুক্ত জনপ্রিয় লোককে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেবে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, জনসম্পৃক্ততা আছে, দল ও জনগণের প্রতি কেমন কমিটমেন্ট আছে, দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে অবস্থান ভালো এমন নেতাদের আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগে মনোনয়ন দেয়া হবে।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ক্লিন ইমেজ, দলের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পাশে থেকেছেন, আনুগত্য-এসব বিবেচনায় নেয়া হবে। পাশাপাশি সাংগঠনিক সম্পাদকের রিপোর্ট, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জরিপও গুরুত্ব দেয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *