পাহাড়ে মনুষ্য সৃষ্ট বিপর্যয়

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: বৃহত্তর চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে মৃত্যু যেন কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না। বরং বছর বছর তা বেড়েই চলেছে। গত ১০ বছরে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলায় পাহাড় ধসে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৪৫০ জনের। প্রতিবছরই বর্ষা মওসুমে এ হতাহতের ঘটনা ঘটছে। কোনো ভাবেই পাহাড় ধস থামানো যাচ্ছে না। সর্বশেষ গত সোমবার মধ্যরাত থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় অন্তত দেড়শজনের মৃত্যু হয়েছে এই পাহাড় ধসে। ধারণা করা হচ্ছে এই লাশের মিছিল আরো বাড়বে। পাহাড়ে এই বিপর্যয় ও এত প্রাণহানি কেবল অতি বর্ষণের পাহাড়ি ঢলের ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়। এটিকে মনুষ্য সৃষ্ট বিপর্যয় বলছে পরিশেবাদীসহ সংশ্লিষ্টরা। ভূমিদস্যুদের অবৈধ পাহাড় কাটা এবং পাহাড়ের গাছপালার অবাধ উজাড়ের ফলে পাহাড়গুলোর গোড়া মাটিশূন্য এবং পাহাড়গুলো বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে বালুময় পাহাড়গুলোর বালু-পাথর-গাছের শিকড়ের যে বন্ধন তা আলগা হয়ে ভূমিধসের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অপরিকল্পিতভাবে বসতি স্থাপন এবং গাছপালা উজাড় করার কারণে এখনও হুমকিতে রয়েছে পাহাড়ি এলাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড় বিনষ্টের এই ঘটনা গত বেশ কয়েকবছর থেকেই চলে আসছে। দীর্ঘদিন থেকে বন উজাড় ও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে দেশের পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলন করলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না কারায় এই বিপর্যয় বলে দাবি করেছেন পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামসহ ৩ পার্বত্য জেলা রাঙামাটি-বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ির জন্য পাহাড় যেমন অলংকার, তেমনি নানা কারণে সেই পাহাড় মৃত্যুর কারণ হয়েও দেখা দিয়েছে। বিগত ২০০৭ সালের জুন মাসে পাহাড় ধসে চট্টগ্রামে ১২৮ জনের মৃত্যুর পর গত ১০ বছরে কিন্তু এ মৃত্যুর হার থেমে থাকেনি। ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৮ বছরে নগরীতেই পাহাড় ধসে মারা গেছেন ১৯৪ জন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আব্দুল মতিনের মতে, পাহাড় ধস শুধু অতি বৃষ্টির কারণেই ঘটেনি, দীর্ঘদিনের পাহাড় কাটা ও বন উজাড়ও এর অন্যতম প্রধান কারণ। অতএব ১টি পরিবেশবান্ধব পাহাড় সংরক্ষণ ও ব্যবহার পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, পাহাড়ি বন ও পাহাড় সংরক্ষণে আমাদের বন বিভাগের ব্যর্থতা সর্বজনবিদিত, অথচ পরিবেশ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নির্বিকার।
চট্টগ্রাম পিপলস ভয়েজ সভাপতি শরীফ চৌহান বলেন, একশ্রেণীর লোক তাদের নিজেদের স্বার্থে পাহাড় কাটছে। আর তাদের বার বার ছাড় দেয়া হচ্ছে। এই ছাড় দেয়ার ফলেই অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সম্মিলিত জলাধার রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক ইবনুল সাঈদ রানা জানান, নানা প্রকল্পের নামে কাটা হচ্ছে পাহাড়, বাণিজ্যিক বা দখলবাণিজ্যেও পাহাড় কাটা হচ্ছে অনবরত। এখন আবার পাহাড় কেটে বসতি স্থাপনের কারণে পাহাড় ধসের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের পাহাড়গুলো পাথরের পাহাড় নয়, এগুলো মূলত মাটির পাহাড় ও বালুময়, তাই এমনিতেই পাহাড়গুলোর ভিত দুর্বল। যেটুকু রয়েছে তাও আবার নির্বিচারে বন উজাড় ও পাহাড় কেটে এর ভিতকে নষ্ট করা হয়েছে, যার ফলেই এতবড় বিপর্যয় ঘটেছে। এত প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, পাহাড় না কাটার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন আছে। আইন প্রয়োগের ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু পাহাড় যারা কাটে তারা রাজনীতির দিক হোক বা অর্থনৈতিক দিক হোক শক্তিশালী বা প্রভাবশালী হওয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ’র সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান পাহাড়ে ভয়াবহ বিপর্যের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, সরকার কর্তৃক পাহাড় ইজারা দেয়া এবং ইজারাদার কর্তৃক অবৈধভাবে পাহাড় কাটা, গাছপালা কাটা এবং পাহাড়ের ঢালে বসতি স্থাপনকে দায়ী করেছেন। পাশাপশি এই অসংখ্য প্রাণহানির দায়-দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে। তারা বলেন, ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও ৩ পার্বত্য জেলায় ৬শ মানুষের পাহাড় ধসে প্রাণহানি ঘটেছে। এ থেকে সরকারের নির্বিকার আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম শহরেই ছোট-বড় শতাধিক পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস রয়েছে ১ লাখের বেশি মানুষ। আর রাঙামাটি-বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় এ ধরনের বসবাসের হার কয়েকগুণ বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই মুহূর্তে এদের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে আগামীতে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে পাহাড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *