ক্রমেই ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে পাহাড়ে

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: এখনও ঝুঁকির মধ্যে পাহাড়িরা। ক্রমেই এই ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে। প্রাকৃতিক কারণে যতটা না ঝুঁকি তৈরি হয়েছে তার চেয়ে বেশি হচ্ছে মানবসৃষ্ট কারণে। বন্দর চট্টগ্রাম ছোট-বড় শতাধিক পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে কয়েক লাখ মানুষ। আর রাঙামাটি-বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় এ ধরনের বসবাসের হার কয়েকগুণ বেশি। যার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই স্থানীয় প্রশাসনের হাতে। শুধু বর্ষা মৌসুমের আগে প্রতি জেলায় পৃথকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়। এবার ৩ পার্বত্য জেলার ২টিতে সেই তালিকাও করা হয়নি। কেন হয়নি? তারও কোনো জবাব মেলেনি। আবার তালিকা করা হলেও করা হয়নি হালনাগাদ। স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষকে আজ দাঁড় করিয়েছে সীমাহীন দুর্যোগের মুখোমুখি।
খোদ চট্টগ্রামে ৩০টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২১ হাজার পরিবারকে অন্যত্র স্থানান্তরের সুপারিশ করেছিল পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারও ঘোষণা দিয়েছিলেন পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করে সলিমপুর এলাকায় স্থানান্তর করা হবে। গত মে মাসে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে পাহাড়ের পাদদেশে মাইকিং করা হয়। লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযানও চালায় স্থানীয় প্রশাসন। উচ্ছেদ অভিযানের সপ্তাহ দু’য়েক আগে কয়েকটি বাড়িঘরের গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ আদালত চলে যাওয়ার দিন কয়েক পরেই ফের গ্যাস, বিদ্যুৎ এনে দিয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। যাদের মধ্যে রয়েছেন জনপ্রতিনিধিও। যার ফলশ্রুতিতে প্রভাবশালীদের আশ্বাস পেয়ে ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে পাহাড়িরা। এজন্য আশির দশক থেকে শুরু হওয়া যত্রতত্র বসতি স্থাপন, বন উজাড়কে মূলত দায়ী করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। পরিবেশ অধিদফতরের হিসেবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির লোলুপ দৃষ্টিতে পড়ে চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ৩০টি পাহাড়। দিনে নয়তো রাতে এসব পাহাড় কেটে কেউ গড়ে তুলেছে জনবসতি, কেউ দোকানপাট, ইটভাটা, শিল্প কারখানা গড়ে তুলছে। নেয়া হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প। নির্মাণ করা হচ্ছে সড়কও। যার ফলে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে পাহাড়। আর বর্ষাকালে ঝুঁকির মাত্রা বেশি হয়। প্রাকৃতিক কারণে যতটা না ঝুঁকি তৈরি হয় তার চেয়ে বেশি হচ্ছে মানবসৃষ্ট কারণে। আর এর মধ্যেই নিম্নবিত্তরা মৃত্যুফাঁদে বসবাস করেন বাধ্য হয়েই।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. রিয়াজ আহমেদ বলেন, ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম জেলায় পাহাড় ধসে ১২৭ জন নিহত হয়। ঐ প্রাণহানির পর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর ১টি তালিকা করা হয়েছিল। তবে এ তালিকা হালনাগাদ করা হয়নি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি ছিল না উল্লেখ করে বলেন, প্রশাসনের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ বসতির সমন্বিত তালিকা নেই। আবার ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে জানানোর কোনো তাগিদও প্রশাসনের নেই। প্রশাসনের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষকে সীমাহীন দুর্যোগের মুখোমুখি করেছে। ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রশাসনের যে প্রস্তুতি ছিল না, এ বিপর্যয়ই তার বড় উদাহরণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসন যদি আন্তরিকতা নিয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করে তবে পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগই আলোর মুখ দেখবে না।
এদিকে পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা ও পুনর্বাসনের জন্য ২০০৭ সালে ১টি বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়। ১০ বছর ধরে ঐ তহবিলের প্রায় ৭৪ লাখ টাকা পড়ে আছে। এছাড়া পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করতে সিটি করপোরেশন ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১টি ভবন নির্মাণ করলেও সেখানে ঠাঁই হয়নি নিম্নবিত্তদের। উল্টো ভবনটি এখন অস্থায়ী নগর ভবনের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নিম্নবিত্তদের জন্য ১টি ভবন নির্মাণ করা হলেও তাতে ঠাঁই হবে মাত্র ৩৩টি পরিবারের। তাই এটি বাদ দিয়ে আমরা নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা করছি।
তবে তিনি স্বীকার করেন, পাহাড়ের পাদদেশে এখনও ঝুঁকিপূর্ণভাবে কয়েক লাখ মানুষ বসবাস করছে। তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। স্থায়ীভাবে তাদের পুনর্বাসনেরও চিন্তা-ভাবনা সরকারের আছে।
এদিকে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তালিকা অনুযায়ী খোদ চট্টগ্রাম শহরে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো হচ্ছে- সলিমপুর বাস্তুহারা পাহাড়, টাইগারপাস-লালখান বাজার রোড সংলগ্ন পাহাড়, সিআরবি পাহাড়ের পাদদেশ, টাইগারপাস মোড়ের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ, মোজাফফরনগর পাহাড়, কাট্টলি থেকে সীতাকু- পর্যন্ত পাহাড়, প্রবর্তক পাহাড়, গোলপাহাড়, ইস্পাহানী পাহাড়, বন গবেষণাগার ও বন গবেষণা ইনস্টিটিউট সংলগ্ন পাহাড়, জয়পাহাড়, চট্টেশ্বরী হিল, মতিঝর্ণা ও বাটালিহিল সংলগ্ন পাহাড়, রেলওয়ে এমপ্লয়িজ গার্লস স্কুল সংলগ্ন পাহাড়, ফয়েস লেক আবাসিক এলাকা পাহাড়, জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটি সংলগ্ন পাহাড়, গরীবুল্লাহ শাহ মাজারের পাশের বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটি সংলগ্ন পাহাড়, ডিসি হিলের চেরাগী পাহাড়ের দিকের ফুলের দোকানগুলোর অংশ, পরিবেশ অধিদফতর সংলগ্ন সিটি করপোরেশনের পাহাড়, একে খান অ্যান্ড কোং-এর পাহাড়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন পাহাড়, কৈবল্যধামে বিশ্ব কলোনির পাহাড়, মিয়ার পাহাড়, লালখান বাজার চান্দমারি রোড সংলগ্ন জামেয়াতুল উলুম ইসলামি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পাহাড়, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট একাডেমির উত্তর পাশের মীর মোহাম্মদ হাসানের মালিকানাধীন পাহাড়, ইস্পাহানী পাহাড় সংলগ্ন দক্ষিণ পাশের হারুন খানের মালিকানাধীন পাহাড়ের পশ্চিমাংশ, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা সংলগ্ন পাহাড়, লেক সিটি আবাসিক এলাকার পাহাড় ও সিডিএ এভিনিউ রোডের পাশে অবস্থিত বেস্নাসম গার্ডেন সংলগ্ন পাহাড়। গত ৮ মে অনুষ্ঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সর্বশেষ সভায় এ পাহাড়গুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পাহাড়কে সুরক্ষিত রাখতে এসব পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা কয়েক লাখ মানুষকে অন্যত্র পুনর্বাসনেরও ঘোষণা দেয়া হয়েছিল এ বৈঠকে। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত আদৌ বাস্তায়িত হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *