পাহাড় ডিঙিয়ে সড়কে উঠতে হচ্ছে

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, রাঙ্গামাটি থেকে: অসুস্থ বোনকে দেখতে গতকাল সোমবার রাঙামাটি শহরের বাসা থেকে বের হন নাসিমা আখতার। যাবেন চট্টগ্রামের রাউজান। ছোট্ট দুটি ছেলেমেয়েকে কারও কাছে রেখে যাওয়ার উপায় নেই, তাই তাদেরও সঙ্গে নিয়েছেন। রাঙামাটি শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে (চট্টগ্রামের দিকে) সাপছড়ি শালবাগান পর্যন্ত অটোরিকশায় কোনোভাবে যেতে পেরেছেন। দুই সন্তানের হাত ধরে কাদামাখা রাস্তায় প্রায় দেড় কিলোমিটারের পথ হাঁটতে হয়েছে তাঁদের। সাপছড়ি শালবাগান পর্যন্ত অটোরিকশা চললেও রাস্তার অনেক জায়গায় ফাটল। এখনো রাস্তার ওপর ধসে পড়া পাহাড়ের মাটি জমে আছে। শালবাগান এলাকায় সড়কের দেড় শ মিটার অংশ পাহাড়ধসে হারিয়ে গেছে। সড়কের অস্তিত্বহীন এই অংশ পার হওয়ার জন্য সবাইকে ডিঙাতে হচ্ছে অন্তত ৫০ ফুট উঁচু একটি বড় পাহাড়। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় সাপছড়ি শালবাগানের অস্তিত্বহীন সড়কের সামনে গিয়ে চোখে পড়ে পথচলতি মানুষের দুর্ভোগ। তাদের কেউ রাঙামাটি থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছে, আবার কেউবা চট্টগ্রাম থেকে রাঙামাটি ফিরছে। কাদা আর বৃষ্টিতে একাকার পথচারীরা। পা পিছলে জামাকাপড়ও নষ্ট করেছে অনেকে। ঢাকা থেকে আসা কলেজশিক্ষার্থী নিটল চাকমা আর তাঁর বোন মিথিলা চাকমার সঙ্গে কথা হয় সাপছড়িতে। নিটল বলেন, দুর্যোগের ছোবলে পড়ে রাঙামাটির এমন অবস্থা হবে তা কল্পনাও করতে পারেননি তাঁরা।
পাহাড়ি কাদামাখা পথ পাড়ি দিয়ে সাপছড়ি শালবাগানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিচ্ছিলেন চট্টগ্রাম থেকে আসা মফিজুর রহমান। তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে শুধু বললেন, ‘ভাই, এ রকম কষ্ট শেষ কবে করেছি মনে নেই।’
মানুষের এমন দুর্ভোগে সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। সড়কের মেরামতকাজ করতে ব্যস্ত সেনাসদস্য এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা শিশুদের কোলে নিয়ে বা হাত ধরে সড়কের ভাঙা অংশ এবং বিকল্প পাহাড়ি পথ পার করে দিচ্ছিলেন। কাদামাখা পথে হাঁটতে গিয়ে বয়স্ক লোকজন যাতে পড়ে না যান, সে জন্য তাঁদেরও সহায়তা করছিলেন। চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা নিউটন দাশ বলেন, ভাঙা সড়ক ও পাহাড়ি পথ পার হতে লোকজনকে সাহায্য করতে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন বাহিনীর কর্মীরা।
সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে রাঙামাটি ফিরছিলেন মো. মহসিন নামের এক ব্যক্তি। তিনি বললেন, ‘ভাগ্যিস ফায়ারের লোকজন সাহায্য করেছে। নইলে পার হতে আরও অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হতো।’
সাপছড়িতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া স্থানে গতকাল তিনটি এক্সকাভেটর (খননযন্ত্র) দিয়ে কাজ করছিলেন সওজ ও সেনাসদস্যরা। সেখানে দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. এমদাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ইচ্ছা রয়েছে এই অস্তিত্বহীন সড়ক মেরামত করে কাল-পরশুর মধ্যে সিএনজি অটোরিকশার জন্য খুলে দেওয়ার। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার জন্য কাজ এগোচ্ছে না।’
রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের দূরত্ব ৭৪ কিলোমিটার। এই সড়কের রাঙামাটি অংশের অন্তত ৬০টি স্থানে সড়কের ওপর পাহাড়ের মাটি পড়ে আছে। ২০টির বেশি জায়গায় বড় বড় ফাটল রয়েছে। দুটি স্থানে সড়কের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে গেছে।
প্রধান সড়ক বন্ধ থাকায় কাপ্তাই হয়ে নৌপথে চট্টগ্রাম যাতায়াত করা গেলেও এতে সময় এবং খরচ দুটোই বেশি লাগছে। বৈরী আবহাওয়ায় যাতায়াতও কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ।
এদিকে পাহাড়ধসে রাঙামাটিতে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ১১৫ থেকে বেড়ে ১১৮ হয়েছে। গতকাল বিকেল পাঁচটায় রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মো. মানজারুল মান্নান তাঁর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ১৩ জুন পাহাড়ধসের ঘটনায় নিখোঁজ তিন ব্যক্তির লাশ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে ওই তিনজনকে নিহত ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন তাঁরা। ফলে এখন নিহত ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়াল ১১৮-তে।
সব মিলিয়ে পাহাড়ধসের ঘটনায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই পাঁচ জেলায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৫৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
গতকালের সংবাদ সম্মলেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক বলেন, আরও দুজন নিখোঁজের কথা শোনা যাচ্ছে। তাঁদের ব্যাপারে আগামীকাল (আজ) তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নিখোঁজ যে তিনজনকে নিহত ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাঁরা হলেন মো. সালাহউদ্দিন (৩০), রহিমা বেগম (২৫) ও মো. দরবেশ (৩২)। তিনজনই রাঙামাটি শহরের রূপনগর এলাকার বাসিন্দা।
জেলা প্রশাসক বলেন, পুরো জেলায় ১ হাজার ৭০০ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তাঁরা প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করেছেন। দু-এক দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ হিসাব দেওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে রাঙামাটির রিজার্ভ বাজার থেকে গতকাল বিকেলে কাপ্তাইয়ের উদ্দেশে একটি লঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর এর তলা ছিদ্র হয়ে যায়। ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকতে থাকলে সারেং তাড়াতাড়ি লঞ্চটিকে তবলছড়ির অদূরে পাহাড়ের পাশে নোঙর করেন। লঞ্চে প্রায় ২৫০ জন যাত্রী ছিল। লঞ্চের যাত্রী সুশান্ত বড়ুয়া বলেন, এম এল রাবেয়া নামের কাঠের লঞ্চটির একটি পাটাতন ফুটো হয়ে পানি ঢুকছিল। সারেং কিছু দূর গিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পাশের একটি পাহাড়ে গিয়ে নোঙর করে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়।
সূত্র: প্রথম আলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *