হয়রানি আর বিড়ম্বনার শিকার ঘরমুখো মানুষ

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: ঈদ আনন্দ যাত্রায় ভোগান্তি, হয়রানি, টিকিট ও সড়ক অব্যবস্থাপনা, ভাড়া নৈরাজ্য, সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা ক্ষেত্রে গলদ থাকায় হয়রানি আর বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ঈদে যাত্রাপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে চলছে চরম নৈরাজ্য। ভাড়া নৈরাজ্য প্রতিরোধে বিআরটিএ ও বিআইডব্লিউ’র পক্ষ থেকে মালিক-শ্রমিকদের নিয়ে প্রতিবছরের মতো গতানুগতিক পদ্ধতিতে ভিজিল্যান্স টিম বা মনিটরিং কমিটি গঠন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে কোথাও তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্ভোগের শিকার যাত্রীরা রাস্তায় আহাজারি করলেও কারও সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা যাত্রীরা রাস্তায় ইফতার বা সেহরি করতে পারছেন না। এমন হাজারো হয়রানি আর বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে ঘরমুখো মানুষ।
লঞ্চ, বাস ও রেল স্টেশন ছাড়াও রাজধানী ত্যাগের বিভিন্ন পয়েন্টে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। তবে যাত্রাপথে দুর্ভোগের শেষ নেই বাড়ি ফেরা মানুষের। অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে লঞ্চে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা করছে দক্ষিণবঙ্গের মানুষ, তেমনি যানজটে নাকাল বাস যাত্রীরাও।
দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের ঢাকা ত্যাগের অন্যতম মাধ্যম সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। অতিরিক্ত যাত্রী নিতে নির্দেশনা অমান্য করে লঞ্চের ছাদে যাত্রী বহন করছেন লঞ্চ মালিকরা। ফলে ঝুঁকি নিয়েই ঢাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন লঞ্চ যাত্রীরা। এছাড়া সময়মতো লঞ্চ না ছাড়া, পন্টুনে হকারদের উৎপাতসহ নানা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা।
তবে লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী উঠানোর বিষয়টি অস্বীকার করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল (যাত্রী পরিবহণ) সংস্থা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল (যাত্রী পরিবহণ) সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- কোনো লঞ্চের ছাদে যাত্রী নেয়া হচ্ছে না। গরমের কারণে হয়তো কেউ ছাদে উঠেছেন। লঞ্চ ছাড়লে তারা ভেতরে চলে আসবেন। লঞ্চ দুর্ঘটনা এড়াতে এবার সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিআইডবিস্নউটিএ কর্তৃপক্ষ। তবে ঘরমুখো যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন সড়কপথে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের শিকার হচ্ছেন তারা। সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনালে দেখা যায়, যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় প্রায় দ্বিগুণ ভাড়ায় পুরনো ফিটনেসহীন বাসে ঢাকা ছাড়ছেন তারা। এমনকি কাউন্টার সার্ভিসগুলোও নির্ধারিত সময়ের বেশ পরে ছাড়ছেন। তবে যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ে ঢাকায় বাস প্রবেশ করতে না পারায় বাস ছাড়তে কখনও দেরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাস মালিকরা।
এদিকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনে ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি বন্ধের দাবিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়েছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, টিকিট অব্যবস্থাপনা, সড়ক অব্যবস্থাপনাসহ ঈদযাত্রার নানা ক্ষেত্রে গলদ থাকায় যাত্রীরা পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। দুর্ভোগের শিকার যাত্রীরা রাস্তায় আহাজারি করলেও কারও সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা যাত্রীরা রাস্তায় ইফতার বা সেহরি করতে পারছেন না।এসব দুর্ভোগের শিকার যাত্রীদের পাশে দাঁড়াতে স্থানীয় সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আহ্বান জানিয়েছে যাত্রীস্বার্থ সংরক্ষণকারী এই সংগঠনটি।
লিখিত বক্তব্যে মোজাম্মেল হক চৌধুরী আরও বলেন, যাত্রী অধিকার প্রতিষ্ঠায় কর্মরত সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সম্প্রতি পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে- দেশে চলাচলরত যাত্রীদের চাহিদার বিপরীতে স্বাভাবিক সময়ে গণপরিবহণে ৩৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতি বৃহস্পতিবার বা জোড়া সরকারি ছুটির আগের দিন এই ঘাটতির পরিমাণ ৪১ দশমিক ৩২ শতাংশে পৌঁছায়, প্রতি ঈদে ২২ রমজান থেকে ২৭ রমজান পর্যন্ত এই গণপরিবহণে ঘাটতির পরিমাণ ৭৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ হলেও ২৭ রমজান থেকে ঈদের দিন পর্যন্ত বিদ্যমান গণপরিবহণের ৪ গুণ বেশি যাত্রী যাতায়াত করে থাকে।
তিনি বলেন, এসময় যাত্রীদের চাহিদার তুলনায় গণপরিবহণের সংকট দাঁড়ায় ৩৭৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত। প্রতিবছর ঈদে এই সঙ্কটকে পুঁজি করে ঘটে থাকে নানা অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও হয়রানি। প্রকৃতপক্ষে গণপরিবহণের চাহিদার বিপরীতে বিশাল ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে আমাদের সরকার, প্রশাসন, পুলিশ, মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতির নেতাদের গলদঘর্ম হতে হয়।
সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়- এবারের ঈদে লম্বা ছুটি কাজে লাগাতে ঢাকা থেকে ৮০ লাখ, চট্টগ্রাম মহানগর থেকে ২২ লাখ, সিলেট থেকে ৬ লাখ, খুলনা থেকে ১২ লাখ, রাজশাহী থেকে ৮ লাখ, বরিশাল থেকে ৪ লাখ মানুষ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাবে। এর মধ্যে ৩ লাখ যাত্রী ওমরা পালনসহ বিদেশে ঈদ ভ্রমণ করবে। এছাড়াও এক জেলা থেকে অপর জেলায় যাতায়াত করবে আরও প্রায় সোয়া ২ কোটি যাত্রী। এসব যাত্রী ৫৮ শতাংশ সড়ক পথে, ২৫ শতাংশ নৌপথে, ১৪ শতাংশ রেল পথে, ৩ শতাংশ আকাশ পথ ব্যবহার করবে।
সাংবাদিক সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. ইকরাম আহমেদ, বিশিষ্ট সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সহ-সম্পাদক ব্যারিস্টার মো. শফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি রুস্তম আলী খান, বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক হোসেন আহমদ মজুমদার, ঢাকা অটোরিকশা চালক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হানিফ খোকন প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *