সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: লালমনিরহাট, সিলেট, মৌলভীবাজার ও কঙ্বাজারের বন্যা পরিস্থিতির ক্রমাবনতি হয়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। দুর্গত এলাকাগুলোতে সঙ্কট ক্রমেই ঘণীভূত হচ্ছে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। একইসাথে এসব এলাকার মানুষজন নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। গতকাল বুধবার বিকেলে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শাহ কামাল বলেন, কয়েক জেলায় সাম্প্রতিক বন্যার প্রেক্ষাপটে মন্ত্রণালয়ে ১টি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সেখান থেকে সার্বক্ষণিক জেলাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। জেলা প্রশাসকরা কেন্দ্রের সঙ্গে জেলার সমন্বয় করছেন। জেলাগুলোতে পর্যাপ্ত ত্রাণ পাঠানো হয়েছে জানিয়ে সচিব বলেন, জেলা প্রশাসকদের চাহিদার ভিত্তিতে প্রয়োজনে আরও ত্রাণ পাঠানো হবে। সিলেট জেলার জন্য ৮শ মেট্রিক টন চাল, ১২ লাখ টাকা ও ২শ প্যাকেট শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে। মৌলভীবাজারের জন্য ৫শ টন চাল ও ১০ লাখ টাকা এবং কঙ্বাজারের জন্য ১শ টন চাল ও ২ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে।
গতকাল জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে ৮টিতে বন্যা পরিস্থিতির কোনও উন্নতি দেখা যায়নি। তবে কিছু কিছু প্লাবিত এলাকায় পানি নামতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক বন্যায় জেলার ৫৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার ৪৬৬ গ্রাম প্লাবিত হয়। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোয় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন পানিবন্দি মানুষজন। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাও। সব মিলিয়ে নারী, শিশু ও বয়স্কদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। ঠিকমতো ত্রাণ পাচ্ছেন না বলে দুর্গতরা অভিযোগ করছেন।
সিলেট প্রতিনিধি জানান, গতকাল বুধবার সিলেট আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, জেলায় আরও ১ সপ্তাহ বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সিলেটের ৮টি উপজেলারও বন্যা পরিস্থিতির কোনও উন্নতি হয়নি। তবে মৌলভীবাজারে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। টানা ৪ দিনের বৃষ্টিতে কঙ্বাজারের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সড়ক ডুবে যাওয়ায় বন্ধ রয়েছে কঙ্বাজার-টেকনাফ যোগাযোগ। মেরিন ড্রাইভ সড়ক হয়ে কঙ্বাজারের সঙ্গে উখিয়া ও টেকনাফের যানবাহনগুলো চলাচল করছে। সিলেটের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার বলেছেন, রোগবালাই মোকাবিলায় প্রতি উপজেলায় মেডিকেল টিম কাজ করছে। পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যার্দুগত এলাকায় ত্রাণ ও অন্যান্য সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। সিলেট আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা সাঈদ আহমদ জানিয়েছেন, জেলায় গতকাল বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ১৪৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, আরও ১ সপ্তাহ বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত মঙ্গলবার সিলেটে ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। বন্যাকবলিত গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, জকিগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, কোম্পানীগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গতকাল বুধবার বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়। ত্রাণ নিয়ে আমাদের কোনও সমস্যা নেই বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার।
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, কক্সবাজার জেলার ৫ উপজেলায় পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন অন্তত ৩ লাখ মানুষ। বন্যাকবলিত এলাকায় টিউবওয়েল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। খাবার পানি সংগ্রহ করতে পানিবন্দি মানুষজনকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
কক্সবাজার ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে চকরিয়া পৌরসভারসহ একাধিক এলাকা। চকরিয়া ছাড়াও জেলার পেকুয়া, ঈদগাঁও, রামু, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কিছু কিছু বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। টানা ৪ দিনের ভারি বর্ষণে এ বন্যা দেখা দেয়। এতে এসব এলাকার অন্তত সাড়ে ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। জেলার বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে আন্তঃসড়কগুলো। ভেঙে গেছে বেড়িবাঁধসহ অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক ও কালভার্ট। এভাবে ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকলে জেলায় বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক অবনতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। বন্যার পানিতে কঙ্বাজার-টেকনাফ সড়ক ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। তবে বিকল্পভাবে মেরিন ড্রাইভ সড়ক হয়ে কঙ্বাজার, উখিয়া ও টেকনাফের মধ্যে যান চলাচল করছে বলে জানা যায়। গত ২৮ ঘণ্টায় কঙ্বাজারে ১৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানায় আবহাওয়া অফিস।
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, কুশিয়ারা নদী এবং হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওড়ের পানি কমতে শুরু করায় মৌলভীবাজারে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে বলে জানা গেছে। মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ইন্দ্র বিজয় শঙ্কর চক্রবর্তী গতকাল বুধবার বিকেলে বলেন, কুশিয়ারা নদীর পানি কমতে শুরু করায় হাকালুকি হাওড় পাড়েও পানি কমতে শুরু করেছে। আশা করি ২-১ দিনের মধ্যে পানি কমে যাবে। মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম বলেন, কুশিয়ারার পানি কমায় জুড়ী, বড়লেখা ও কুলাউড়ার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। তাছাড়া সিলেট, মৌলভীবাজারে গতকাল বুধবার ভারি বৃষ্টি হওয়ার পূর্বাভাস থাকলেও অত বৃষ্টি হয়নি। গত বুধবার মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের ৩৪০ পরিবারে মধ্যে ১৩ কেজি করে গম ও ৫০ পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে বলে জানান মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক।
মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস জানিয়েছে, বন্যার কারণে ১৪২টি প্রাথমিক ও ৪১টি মাধ্যমিক স্কুলে পাঠদান স্থগিত রয়েছে।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি কমে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গতকাল বুধবার দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ দোয়ানী পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তিস্তার অভ্যন্তরে চর ও নিম্নাঞ্চলের বেশকিছু বসতবাড়ি এখনও পানিতে ডুবে আছে। গত শনিবার ও রোববার তিস্তা নদীর তীরবর্তী হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি থাকলেও এখন পর্যন্ত তাদের মাঝে কোনো ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সূত্র মতে- গত শনিবার ও রোববার উজানের নেমে আসা পানিতে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ দোয়ানী পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এতে তিস্তা তীরবর্তী নিম্ন ও চরাঞ্চলের বেশকিছু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এতে হাতীবান্ধা উপজলায় সবচেয়ে বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে ও ধুবনী গ্রামে ১টি বাঁধের ২ স্থানে ভেঙে যায়। হাতীবান্ধা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফেরদৌস আহম্মেদ জানান, ত্রাণ বরাদ্দ চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়েছে। দ্রুত ত্রাণ বরাদ্দ আসবে। হাতীবান্ধা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ এনামুল কবির জানান, ধুবনী গ্রামে তিস্তা নদীর তীরবর্তী যে স্থানে বন্যার পানিতে রাস্তা ভেঙে গেছে তা মেরামত চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *