বন্যায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ত্রাণ অপ্রতুল

টাইমস আই বেঙ্গলী ডকটম, ঢাকা: ভারতের উজান থেকে ধেয়ে আসা ঢলে সৃষ্ট বন্যায় সিলেটে সুরমা ও কুশিয়ারার ৪ পয়েন্টে গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত পানি কমেছে। কমছে খুব ধীর গতিতে। প্লাবিত এলাকার পানি অত্যন্ত ধীরগতিতে কমতে থাকায় দুর্ভোগ কমছে না পানিবন্দি মানুষের। ফলে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলাসহ সবগুলো নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পানি বাড়তে থাকায় নদ-নদী অববাহিকার শতাধিক চর দ্বীপচরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ১২ হাজার পরিবারের ৫০ হাজার মানুষ। পানিবাহিত অসুখ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ না থাকায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। এদিকে দেশের পূর্বাঞ্চল সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা রয়েছে বলে পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। সুরমা ও কুশিয়ারার পানি ৪টি পয়েন্টে এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া গত ২ দিনের প্রচ- বৃষ্টিপাতে নদীগুলোর পানি বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম। এ অবস্থায় পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত ঈদুল ফিতরের সময় থেকে শুরু হওয়া বন্যায় সিলেট জেলার ৭টি উপজেলার আড়াই লাখ পানিবন্দি মানুষ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।
শুধু সিলেটই নয় কুড়িগ্রামসহ বন্যাদুর্গত এলাকায় এখন প্রধান সমস্যা ত্রাণসঙ্কট। সরকারি-বেসরকারিভাবে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীরা। ত্রাণের জন্য বন্যাদুর্গত বিভিন্ন এলাকায় চলছে হাহাকার। কিন্তু বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণের কোনো সঙ্কট নেই বলে দাবি করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী- সিলেটের কানাইঘাটে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া আমলসীদে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ৬১ সেন্টিমিটার, শেওলায় ৬২ সেন্টিমিটার ও শেরপুরে ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে বন্যায় স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সিলেটের প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। পানিবাহিত অসুখ মোকাবিলায় যে ওষুধ মজুদ রাখা হয়েছে তা পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। সিলেট জেলার বন্যাকবলিত ৭টি উপজেলায় সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতিতে আক্রান্ত এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে মাঠে কাজ করছে সিলেট সিভিল সার্জনসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
সিলেটের সিভিল সার্জন হিমাংশু লাল রায় বলেছেন, বন্যার কারণে জেলার দক্ষিণ সুরমা, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও জকিগঞ্জে মোট ২৪টি ইউনিয়নের ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৩শ ৯২ জন পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। বন্যাদুর্গত এলাকায় চিকিৎসা সেবায় কাজ করছে ৭৮টি মেডিকেল টিম। জেলা প্রশাসনের হিসেবে বন্যায় ৮টি উপজেলার ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭শ ৫৫ জন লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বন্যায় আক্রান্ত ইউনিয়নগুলোতে মোট ১শ ৪৮টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে ১ জন মেডিকেল অফিসার কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করছেন। যে ইউনিয়নের জনসংখ্যা বেশি, সে ইউনিয়নে ২ থেকে ৩টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।
জেলা প্রশাসনের হিসেব অনুযায়ী- বন্যায় সিলেটের ৮টি উপজেলার ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭৫৫ জন লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুর্গতদের সাহায্যে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শহীদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, সিলেটের ৮ উপজেলার ২৪টি ইউনিয়নের ৪৬৬ গ্রাম বন্যাকবলিত হয়েছে। এসব এলাকার ১৭ হাজার ৮৫৮ পরিবারের ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭৫৫ জন লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাছাড়া ৪ হাজার ৪৯১টি ঘরবাড়ির বন্যায় ক্ষতি হয়েছে। বন্যার কারণে বন্ধ রয়েছে ২শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান। তিনি জানান, এ পর্যন্ত ৩১৩ টন চাল ও ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৫শ টাকা ৮টি উপজেলায় পাঠানো হয়েছে। পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুদ রয়েছে।
সিলেট সিভিল সার্জন সূত্রে জানা যায়, বন্যায় আক্রান্ত মানুষদের নিরাপত্তার জন্য সরকারিভাবে বালাগঞ্জে ৩টি, ফেঞ্চুগঞ্জে ৩টি ও বিয়ানীবাজারে ৫টি, মোট ১১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা রাখা হয়েছে।
প্রশাসনিক হিসেবে সিলেট জেলায় বন্যায় আক্রান্ত ইউনিয়নগুলো হলো-দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জালালপুর, মোগলাবাজার, দাউদপুর, বালাগঞ্জ উপজেলার দেওয়ানবাজার, পূর্ব পৈলনপুর, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর উপজেলার সাদিপুর, পূর্ব পৈলনপুর, গোয়ালাবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ফেঞ্চুগঞ্জ, ঘিলাছড়া ও মাইজগাঁও, গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাদেপাশা, শরীফগঞ্জ, বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই, দুবাগ, শেওলা, কুড়ারবাজার, মাথিউরা, তিলপাড়া, মোল্লাপুর, মুড়িয়া, লাউতা এবং জকিগঞ্জ উপজেলার বিরশ্রী ইউনিয়ন।
প্রতিটি উপজেলার মধ্যে সিলেট সদরে কর্মরত মেডিকেল টিমের সংখ্যা ১১টি, দক্ষিণ সুরমায় ১১টি, বিশ্বনাথে ১০টি, বালাগঞ্জে ৭টি, ওসমানীনগরে ৮টি, ফেঞ্চুগঞ্জে ১০টি, গোলাপগঞ্জে ১৬টি, বিয়ানীবাজারে ১৬টি, জকিগঞ্জে ১০টি, কানাইঘাটে ১২টি, গোয়াইনঘাটে ১১টি, জৈন্তাপুরে ১১টি, কোম্পানীগঞ্জে ১০টি ও জেলা সদরে ৫টি। সব মিলিয়ে ১৪৮টি মেডিকেল টিমের মধ্যে মোট বন্যা আক্রান্ত এলাকায় কর্মরত রয়েছে ৭৮টি টিম।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর গত কয়েকদিনের বর্ষণে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলাসহ সবগুলো নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।পানি বাড়তে থাকায় নদ-নদী অববাহিকার শতাধিক চর-দ্বীপচরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ১২ হাজার পরিবারের ৫০ হাজার মানুষ। গতকাল শুক্রবার ভোর ৬টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার মাত্র ১৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আর গত ২৪ ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ১৬ সেন্টিমিটার।পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ডুবে যাওয়া বাড়িঘরগুলোর পানিবন্দি মানুষজন গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। এ অবস্থায় দূরে জেগে থাকা চরগুলোকে দ্বীপের মতো মনে হচ্ছে। বর্তমানে এসব এলাকার মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে কলাগাছের ভেলা বা নৌকা। জেলার সদর উপজেলার কাচীরচর ও চর পিপুলবাড়ী কমিউনিটি ক্লিনিকের চারদিকে পানি ওঠায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। তবে বিকল্পভাবে রোগীদের চিকিৎসা অব্যাহত রেখেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ১৬ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ১৬ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া নুনখাওয়া পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ১৭ সেন্টিমিটার, ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে ০৬ সেন্টিমিটার ও তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ৪১ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *