‘ইসলামি ভোট ব্যাংক’ এখন কার?

বাছির জামাল: রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। আজ যে শত্রু, কাল সে মিত্র হবে না তা নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। বছর কয়েক আগেই হেফাজতে ইসলাম সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তারা তখন বিএনপির প্রত্যক্ষ মদদও পেয়েছে। সেই হেফাজত এখন সরকারি দলের অনেকটাই কাছাকাছি। তাদের নেতার সঙ্গে মাস কয়েক আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক হয়েছে। হেফাজতের কিছু ইচ্ছেও পূরণ করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। অথচ ২০১৩ সালের ৬ মে ভোর রাতে যদি রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে হেফাজতিদের বিতাড়িত করা না হতো, তাহলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তখনকার সরকারের অস্তিত্বই থাকত না বলে অনেকেই মনে করেন। অথচ কয়েক বছরের ব্যবধানে হেফাজত এখন আওয়ামী লীগের ‘সখা’। নিজের জোটের শরিক দল ও সহানুভূতিশীল বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে যে গ্রিক ন্যায়ের দেবীর ভাস্কর্য সরানো হলো, তার পেছনে নাকি আওয়ামী লীগের এই উদ্দেশ্যই কাজ করেছে যে, হেফাজত তাদের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে। আর সবই নাকি হচ্ছে আগামী নির্বাচনকে ঘিরে। অর্থাৎ হেফাজতকে সরানোর শাপলা চত্বরের ‘নির্মম’ ঘটনায় ‘ইসলামি ভোটের’ ওপর যে প্রভাব পড়েছিল, তা ‘মেরামত’ করতেই আওয়ামী লীগ এসব নানা উদ্যোগ নিচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলের বিশ্বাস।
ইসলামি দলগুলোর প্রতি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ‘ঝুঁকে’ পড়ার কারণে ‘ইসলামি ভোট ব্যাংক’ নিয়ন্ত্রণে এতদিন ধরে চলে আসা বিএনপির একাধিপত্য কি শেষ হতে চলল? একাদশ নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে, ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে আওয়ামী লীগের ‘ঘনিষ্ঠতা’ ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে দেখে রাজনৈতিক অভিজ্ঞমহলের মধ্যে এ প্রশ্নটি উঠেছে। তবে বিএনপি মনে করে, ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে তাদের সখ্যকে সামান্য প্রলোভনে কেউ চিড় ধরাতে পারবে না। ক্ষমতাসীন দল যতই কাছে টানতে চেষ্টা করুক না কেন চূড়ান্ত পর্যায়ে ইসলামি দলগুলোর ‘অধিকাংশ ভোট’ যাবে বিএনপির বাক্সেই। তাই এ নিয়ে কোনো টেনশন নেই বিএনপির।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত অধিকাংশ ইসলামি দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সঙ্গেই আছে। ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ, ইসলামি ঐক্য আন্দোলন, জাকের পার্টিসহ কয়েকটি দল এ জোটের বাইরে থাকলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের জোটগত কোনো ঐক্য নেই। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে সুফীবাদী তরীকত ফেডারেশন ছাড়া কোনো ইসলামি দল নেই। মাজারকেন্দ্রিক এ দলটির আবার ইসলামি ভোটে তেমন কোনো প্রভাব নেই। এ কারণে আওয়ামী লীগ নতুন করে এ ব্যাপারে পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে বলে ক্ষমতাসীন দলের কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
আওয়ামী লীগ ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওলামা লীগ বিলুপ্ত করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য আলেমদের নেতৃত্বে নতুন ইসলামিক ফ্রন্ট গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরই মধ্যে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাদেরই ঘনিষ্ঠ মিত্র জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে নতুন জোট আত্মপ্রকাশ করেছে চলতি বছরের ৬ মে। ‘বাংলাদেশ জাতীয় জোট’ নামের এ জোটে রয়েছে প্রাথমিকভাবে জাতীয় পার্টি ছাড়াও নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দল ইসলামিক ফ্রন্ট, মাসখানেক আগে ৩৪টি ইসলামপন্থি সংগঠনকে নিয়ে আত্মপ্রকাশ করা ‘জাতীয় ইসলামি মহাজোট’ এবং ২০১৫ সালে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করে পরে তাকেই অব্যাহতি দেওয়া ৩১ সংগঠন। প্রয়াত মুফতি ফজলুল হক আমিনীর দল ইসলামি ঐক্যজোট ২০ দলীয় জোট থেকে বের হয়ে গেছে। এরশাদের নেতৃত্বে নতুন ইসলামি জোটের আত্মপ্রকাশ, ২০ দল থেকে ইসলামি ঐক্যজোটের বের হয়ে যাওয়ার পেছনে সরকারের ‘প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত’ রয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। আবার সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ন্যায়বিচারের প্রতীক গ্রিক নারী মূর্তি সরানোর পেছনে হেফাজতের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের একটি সমঝোতারই ইঙ্গিত দেখতে চান তারা।
সরকারের সঙ্গে সমঝোতার ব্যাপারে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ বলেন, হেফাজতে ইসলাম একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। এ সংগঠনের সঙ্গে নির্বাচন বা ভোটের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে যা কিছু হয়েছে, তা এ দেশের আলেম-ওলামার কল্যাণে। তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসা ও আলেম-ওলামার কল্যাণের স্বার্থেই হেফাজতে ইসলাম কাজ করে যাবে। এ দলের কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ নেই।
এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ হেফাজতসহ ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করছে আগামী নির্বাচনে ভোটের হিসাব-নিকাশকে সামনে রেখে। তবে ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক রয়েছে, তা সমুন্নত রাখার জন্য আমরাও পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছি।
সেই পরিকল্পনা কি জানতে চাইলে বিএনপির একাধিক নেতা জানান, আসলে হেফাজতে ইসলামসহ ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে আওয়ামী লীগ নতুন করে যে সম্পর্ক গড়তে চাচ্ছে, তাতে আগামী নির্বাচনে ‘বিএনপির ইসলামি ভোট ব্যাংকে’ তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। এর কারণ হিসেবে তারা জানান, আওয়ামী লীগ সেক্যুলারিজমে বিশ্বাস করে যা ইসলামি দলগুলোর আদর্শের সঙ্গে যায় না। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে ইসলামপন্থিদের ওপর নির্যাতন ইসলামি দলগুলো ভুলতে পারবে না। আর ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলায় বড় বাধা আওয়ামী লীগের মিত্ররাই। আল্লামা আজিজুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমঝোতা করেছিল। কিন্তু দলের ভেতর থেকেই এ ব্যাপারে বিরোধিতা সৃষ্টি হওয়ায় সেই সমঝোতা আর টিকে থাকেনি।
তবে হেফাজতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বৈঠকের পর ‘ইসলামি ভোট’ নিয়ে বিএনপির মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে সত্য। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মন্তব্য থেকেই এ কথাটা বের হয়ে এসেছে। তবে তিনি মনে করেন, হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর কিছুটা ইল্যুশন তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের (অর্থাৎ কওমিপন্থিদের) ৭০-৮০ শতাংশ ভোট আমাদের বাক্সেই আসবে।
এর কারণ হিসেবে বিএনপির নেতারা মনে করেন, হেফাজতে ইসলাম একটি প্লাটফরম। এই সংগঠনে শুধু জামায়াত ছাড়া ২০ দলীয় জোটের অন্য শরিক ইসলামি দলগুলোও রয়েছে। যেমনÑ খেলাফত মজলিস, ইসলামিক পার্টি, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম, মুসলিম লীগ ও মাওলানা এম এ রকিবের নেতৃত্বাধীন ইসলামি ঐক্যজোট। ২০ দলীয় জোটে থাকা ইসলামি ঐক্যজোটে রয়েছে নেজামে ইসলাম (এম এ রকীব-আবদুল করীম খান নেতৃত্বাধীন), খেলাফতে রাব্বানী (মুফতি ফয়জুল হক জালালাবাদী নেতৃত্বাধীন)। আগামী নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যদি হেফাজতে ইসলাম কোনো সমঝোতায় যেতে চায়, তাহলে ২০ দলীয় জোটের এই শরিক দলগুলোর সম্মতিতেই হতে হবে। কিন্তু আপাতত এমন কিছু যে হওয়ার নয়, তা ২০ দলীয় জোটের শরিক দল খেলাফত মজলিসের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাকের কণ্ঠে অনুরণন পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, ইসলামি ভোটারদের কাছে বিএনপির বিকল্প এখনো অন্য কোনো দল হয়ে ওঠেনি। তিনি স্বীকার করেন, তার দল খেলাফত মজলিসসহ অন্যান্য ইসলামি দলকে বিএনপি যথাযথ মূল্যায়ন করেনি। তার পরও তারা বিএনপির সঙ্গে আছে ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে।
অন্যদিকে এত নির্যাতন-নিষ্পেষণের পরও জামায়াতে ইসলামীর বিএনপির সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাদের নিবন্ধন আপাতত নেই। হাইকোর্টের রায়ে তা বাতিল হয়ে গেছে। ‘জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল’ এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রয়েছে। জামায়াত যদি সংগঠনগতভাবে নির্বাচনে অংশ না নিতে পারে তাহলে তারা বিএনপির সঙ্গে একটি সমঝোতা করে আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছে। যদি এ ধরনের কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে বিএনপির ক্ষতি হতে পারে এমন কোনো কাজ জামায়াত করবে না বলে জানা গেছে।
এ অবস্থায় বিএনপি মনে করে, ইসলামি ভোটকে কাছে টানার জন্য আওয়ামী লীগের নানা উদ্যোগে তাদের কোনো টেনশন নেই। তবে আওয়ামী লীগও কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। নির্বাচনের সময় যত কাছে আসবে, ইসলামি ভোট কাছে টানতে আওয়ামী লীগ আরো কী কী উদ্যোগ নিচ্ছে ততই তা স্পষ্ট হবে।

লেখক: বাছির জামাল, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *