রাজধানীর জলাবদ্ধতার মূল কারণ খাল দখল

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: রাজধানীর ৪৬টি খালের মধ্যে বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার নথিতে ২৬টি খালের অস্তিত্ব রয়েছে। ভূমিদস্যুদের থাবায় বাকি ২০টি খাল বিলীন হয়ে গেছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, খালের সংখ্যা ছিল ৫২টি। এখন যে ২৬টি খাল আছে তাও রয়েছে অস্তিত্ব সংকটে। যে কারণে সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো নগরজুড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতার। আর সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয় নগরবাসীকে। আর এই চিত্র দেখে অবশেষে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হো?সেন বলেছেন, আমি প্রমিজ করছি, সামনের বছর থেকে আর এসব (জলাবদ্ধতা) দেখবেন না। কিছুদিনের মধ্যেই নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে। খন্দকার মোশাররফ বলেন, বৃষ্টির কারণে বর্তমান জলাবদ্ধতা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতিটা আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে। আমরা বুঝতে পারছি, কোন জায়গাতে আটকা পড়ছি। সে জায়গায় দ্রুত ব্যবস্থা নেব। তিনি বলেন, জরিপ করে দেখেছি, ঢাকার ৪৬টি খালের মধ্যে ১৮টি সংস্কার করতে হবে। এগুলো অবশ্যই করতে হবে।
জলাবদ্ধতার মূল কারণ নিয়ে সমপ্রতি ঢাকার খালগুলোর একটি সচিত্র প্রতিবেদন তৈরি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। এতে দেখা গেছে, ঢাকা মহানগরীতে খালের সংখ্যা ৪৩টি। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসা রক্ষণাবেক্ষণ করে ২৬টি। ৯টি খাল রাস্তা, বঙ্ কালভার্ট ও ব্রিক স্যুয়ারেজ লাইনে পরিবর্তন করা হয়েছে। বাকি ৮টি খাল রয়েছে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে।
গত ১৬ জুলাই নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএনসিসির আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয় সভায় ঢাকায় জলাবদ্ধতার কারণ এবং রাজধানীর খালগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনটি তৈরি করেন ডিএনসিসি’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শরীফ উদ্দিন।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিদ্যমান খালগুলোর মধ্যে রামচন্দ্রপুর খাল ১০০ ফুটের জায়গায় ৬০ ফুট, মহাখালী খাল ৬০ ফুটের জায়গায় ৩০ ফুট, প্যারিস খাল ২০ ফুটের স্থলে ১০-১২ ফুট, বাইশটেকি খাল ৩০ ফুটের স্থলে ১৮-২০ ফুট, বাউনিয়া খাল ৬০ ফুটের বদলে ৩৫-৪০ ফুট, দ্বিগুণ খাল ২০০ ফুটের বদলে ১৭০ ফুট, আবদুল্লাহপুর খাল ১০০ ফুটের বদলে ৬৫ ফুট, কল্যাণপুর প্রধান খাল ১২০ ফুটের স্থলে স্থানভেদে ৬০ থেকে ৭০ ফুট, কল্যাণপুর ‘ক’ খালের বিশাল অংশ এখন সরু ড্রেন, রূপনগর খাল ৬০ ফুটের স্থলে ২৫ থেকে ৩০ ফুট, কাটাসুর খাল ২০ মিটারের বদলে ১৪ মিটার, ইব্রাহিমপুর খালের কচুক্ষেত সংলগ্ন মাঝামাঝি স্থানে ৩০ ফুটের স্থলে ১৮ ফুট রয়েছে। এসব খালের অধিকাংশ স্থানে প্রভাবশালীরা দখল করে বহুতল ভবন, দোকানপাট ও ময়লা অবর্জনায় ভরাট করে রেখেছে। ফলে খালে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় বিলীন হয়ে গেছে খালের অস্তিত্ব।
রামচন্দ্রপুর খাল শুরু নবোদয় প্রধান সড়কের ৮নং রোড থেকে। খালটির এ অংশ থেকে ৬০০ মিটার পর ওয়াসা পাম্প সংলগ্ন অংশে অবৈধ বহুতল স্থাপনা নির্মাণ ও ময়লা আবর্জনার স্তূপ জমে আছে। এ খাল পাড়ের ৩০ ফুট জায়গা ভরাট করে রাস্তা তৈরি করেছে সিটি কর্পোরেশন। এছাড়া নবোদয় প্রধান সড়কের ১০নং রোডস্থ সুনিবিড় হাউজিং বিশাল অংশ দখল করে স্থাপনা তৈরি করেছে।
ডিএনসিসি’র ৩৩ ও ৩৪নং ওয়ার্ডের বিশাল অংশজুড়ে কাটাসুর খালের অবস্থান। এ খালটির দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৭১৫ মিটার। বর্তমানে খালের শুরুর অংশে ১৪ মিটার এবং শেষাংশে ২০ মিটার প্রস্থ রয়েছে। ১৫০ বর্গমিটারজুড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। তাছাড়া ১ হাজার ৫৪৫ মিটার অংশ ময়লা ও আবর্জনায় ভরা। এ খালটির ১৬৫/৫, পুলপার ৬৭/৫ পশ্চিম কাটাসুর, ২৫২/১ বসিলা রোড, বেড়িবাঁধ রোড কালভার্ট, মোহাম্মদপুর হাউজিং, নবোদয় হাউজিং ও ৩নং রোড কালভার্টের দক্ষিণ পাশে খালের মধ্যে ১টি মসজিদ ও ১টি গির্জা গড়ে ?উঠেছে। এসব এলাকায় ৬০ ফুট প্রস্থের স্থলে ৩০ ফুট রয়েছে।
কসাইবাড়ী খালের অস্তিত্বই নেই। উত্তরার দক্ষিণ আজমপুর থেকে শুরু হয়ে কসাইবাড়ী হয়ে মোল্লারটেক পর্যন্ত বিস্তৃতি ছিল এ খালটির। এখন এটি পরিণত হয়েছে ড্রেনে। এর দৈর্ঘ্য ছিল ৮ হাজার মিটার এবং প্রস্থ ১০ থেকে ১২ মিটার আছে।
কল্যাণপুর ‘খ’ খাল কাগজে-কলমে ৪০ ফুট হলেও অনেক জায়গায় খালের কোনও অস্তিত্ব নেই। কোনো কোনো জায়গায় ৯-১২ মিটার দেখা গেছে। কোথাও কোথাও ময়লা আবর্জনা ভরে প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এ খালটির দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪০ কিলোমিটার।
শীতলক্ষ্যা নদী হতে উৎপন্ন হয়ে ক্রমশ সরু হয়ে ঘোপদক্ষিণ মৌজার পশ্চিমপ্রান্তে বাওয়ানী জুট মিলের ভেতরে গিয়েছিল ঘোপদক্ষিণ খাল। এ খালটির বর্তমানে কোনো অস্তিত্ব নেই। খালটি অধিগ্রহণ করে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে জলাবদ্ধতা দূর করতে বেশকিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য খালের ওপর নির্মিত অবৈধ স্থাপনা অপসারণ, প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ, বিলীন হওয়া খাল উদ্ধার, পুনঃখনন ও বর্ষা মৌসুমের আগে খাল পরিষ্কার করতে হবে।
এ বিষয়ে কথা বলতে বারবার চেষ্টা করেও ঢাকা উত্তরের মেয়র আসিনুল হককে পাওয়া যায়নি। তবে চলতি মাসের ১৬ তারিখে জলাবদ্ধতা নিয়ে ডিএনসিসি’র সমন্বয় সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন ওয়াসা থেকে নিয়ে ঢাকার খালগুলো সিটি কর্পোরেশনকে দেয়ার ঘোষণা দেন। তখন ?ডিএনসিসি’র মেয়র আনিসুল হক বলেন, আমরা তো খাল নিতে চাই। কিন্তু ওয়াসার খালতো বিকলাঙ্গ রোগী। রোগী ভালো করে বাচ্চা আমাদের দিয়ে দেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, ঢাকার জন্য জলাবদ্ধতা বড় একটি সমস্যা। আমরা বিভিন্ন খাল উদ্ধারে বিভিন্ন সময় অভিযান করেছি। নন্দীপাড়া খালের ওপর স্থাপিত মার্কেট ভেঙে দিয়েছি। কিন্তু দখল হওয়া কিছু কিছু স্থাপনায় উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে। আমরা আইনিভাবে সেগুলো মোকাবিলার চেষ্টা করছি।
এ বিষয়ে সম্মিলিত জলাধার রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল দখলমুক্ত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। রাজধানীতে একসময় ৫২টি খাল ছিল। তা এখন ২৬টিতে পৌঁছেছে। তার মধ্যেও খালগুলোর প্রবাহে বাধা দিচ্ছে প্রভাবশালীরা। এই প্রভাবশালীদের খুঁজে বের করে এখনি আইনের আওতায় আনা সম্ভব না হলে অল্প বৃষ্টিতেই ডুববে ঢাকা।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, পানি নিষ্কাশনের দুটি পথ রয়েছে। প্রথমত ভূ-গর্ভে পানি শোষণ করে নেয়া এবং অন্যটি খাল বিল ও ড্রেন দিয়ে নদীতে চলে যাওয়া। রাজধানী ঢাকায় এই ২টি পথের একটিও কার্যকর নেই। যে কারণে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিকল্পিত উপায়ে খাল উদ্ধার করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *