মডেল আছে তারকা নেই

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: টেলিভিশন খুললেই বিজ্ঞাপন। কত শত মডেল। কিন্তু কোথায় যেন কমতি। ভুল বোঝার অবকাশ নেই, ভালো বিজ্ঞাপন যে হচ্ছে না এমনটা মোটেও নয়। সারাবিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন যথেষ্ট সুনাম অর্জন করছে। তাহলে কী? সেই গল্প আর হয় না। মায়ের জন্য মুঠোফোন নিয়ে যাচ্ছে ছেলে। পথের ক্লান্তি ভুলে সে এগিয়ে যাচ্ছে। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে একসময় মায়ের হাতে ছেলে তুলে দেয় সেই কাঙ্ক্ষিত মুঠোফোন। ২০০৪ সালের টিভি পর্দায় প্রচার হতো এমনই একটি বিজ্ঞাপন। বলা যায়, আজকের অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী আলোচনায় এসেছিলেন ওই একটি বিজ্ঞাপন দিয়ে। কিংবা তিশার উদাহরণ টানা যায়। নোবেলের সাথে কেয়া বিউটি সোপের বিজ্ঞাপনটির মডেল হয়ে রাতারাতি তারকা বনে যায়। অলিম্পিক ব্যাটারির বিজ্ঞাপনে মডেল হয়ে ব্যাপক পরিচিতি পান মিতা নূর। নোবেল, পল্লব, মৌ, তানিয়া, ফয়সাল, জয়া আহসান, সুইটি, তিশা, মৌসুমী বিশ্বাস, শম্পা রেজা, সজল, অপূর্ব, প্রভাসহ এ রকম আরও অনেকেই রয়েছেন। সবার নাম লিখতে গেলে হয়তো পাঠকরাও বিরক্ত হতে পারেন। প্রত্যেকেরই রয়েছে কোন না কোন সিগনেচার বিজ্ঞাপন। যে বিজ্ঞাপনটি করে রাতারাতি তারকা বনে গেছেন। একটা সময় বিজ্ঞাপন ছিলো মডেল নির্ভর। হঠাৎ করে কেমন যেন উধাও হয়ে গেছে সেই মডেল তারকা ট্রেন্ডটা!
বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে মডেল ও তার জনপ্রিয়তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে একজন মডেল যত বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেন দর্শকের, তত বেশি পণ্যের পরিচিতি ও বিক্রি বাড়বে। বিজ্ঞাপন জনপ্রিয় হলে মডেলও তারকাখ্যাতি পান। বিশ্বজুড়ে প্রচলিত রয়েছে, শোবিজে প্রবেশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো মডেলিং। সেটা যে শুধু টিভি বিজ্ঞাপন হতে হবে তা নয়। র‌্যাম্প মডেলিং কিংবা স্টিল অ্যাডের মাধ্যমেও মডেলিংয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। তার নমুনা এ দেশেও রয়েছে। যেমন জয়া আহসানের মডেলিং ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল স্টিল অ্যাডের মাধ্যমে। দীর্ঘদিন তিনি স্টিল অ্যাডের মডেল ছিলেন। এতে তার পরিচিতিও আসে। তারও অনেক পরে তিনি টিভি বিজ্ঞাপন কিংবা নাটকে যুক্ত হন। এখনতো সিনেমায় আছেন।
এখনকার সময়ে ভালো বিজ্ঞাপনের প্রধান উপাদেয় হচ্ছে ভালো গল্প। গ্ল্যামারের চেয়ে গল্পের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়া হয়। একটা সময়ে যেমন বিজ্ঞাপন মানেই গ্ল্যামার পূর্ণ ছিলো। বর্তমানে বিজ্ঞাপনে গল্প না থাকলে দর্শকপ্রিয়তা কিংবা আলোচনা তৈরী করছে না। গল্পগুলোই তারকা বনে যাচ্ছে। কারণ নির্মাতারা মডেল তৈরীর চেয়ে গল্পের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়েছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের জন্য নির্মাতা আশুতোষ সুজন তৈরি করেন নারী নিগ্রহ ও নির্যাতনবিরোধী একটি বিজ্ঞাপনচিত্র। এটি অনলাইনে বেশ আলোচনার সৃষ্টি করে। বিজ্ঞাপনটি দেখে যতটা না গল্পের প্রশংসা সবাই করেছেন। ততটা কিন্তু মডেলকে নিয়ে আলোচনা হয়নি। সেই মডেল কিন্তু রাতারাতি তারকা বনে যাননি।
বর্তমান সময়ে গ্ল্যামারের বিজ্ঞাপনের চেয়ে গল্প নির্ভর বিজ্ঞাপন তৈরির অন্যতম পথিকৃত হচ্ছে অমিতাভ রেজা । তিনি বলেন ‘সময়ের সাথে সাথে সবকিছুরই পরিবর্তন আসে। আমরা যারা গল্প নির্ভর বিজ্ঞাপন বানাতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি। আমরা প্রথম দিকে বা আজ থেকে দশ বছর আগে খাপ খাওয়াতে বেশ কষ্ট হয়েছে। আস্তে আস্তে আমরা যত গল্প দিয়েছি। মানুষ আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। আমিও অনেক বাজেট দিয়ে বাংলালিংকের দেশ বিজ্ঞাপন করেছি। সেটা ছিল সে সময়কার সুন্দর ছেলে মেয়েদের নিয়ে, গ্ল্যামার পূর্ণ ছিলো সেসব বিজ্ঞাপন। পাশাপাশি বাংলালিংকের সেই বিজ্ঞাপনটির কথা মনে পড়ে? বংশপরম্পরায় শোষণ করা আড়তদারদের পাতা জাল থেকে মুক্ত হওয়ার আনন্দে এ প্রজন্মের জেলে বলে ওঠেন- ‘সেই দিন কি আর আছে, দিন বদলাইছে না?’ সে সময় দুটি বিজ্ঞাপনই হিট ছিলো। বিজ্ঞাপন দুটিতে যারা মডেল ছিলো। ওরা সবাই আজ স্ব স্ব স্থানে ভালো অবস্থানে আছে। আমরাও মনে করছি বিজ্ঞাপনগুলোতে এমন কোন মুখকে নেই যে টিকে থাকার মতো। আসলো আর গেলো। সেটা আমাদের জন্যও একটা ডিসক্রেডিট। বরং ভালো করলে মুখ উজ্জ্বল হয়। তৃপ্ত হই, একটা ছেলে বা মেয়েকে চান্স দিলাম। সে তার যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। কিন্তু এখন যেমন প্রতিনিয়ত নতুন গল্পকে স্টাবলিশড করার জন্য সবাই নতুন মুখ খুজছে। তাহলে গল্পটা বেশি ফোকাস হয়। একজন তারকাকে নিলে তারকাই বেশি ফোকাসড হয়। আমার মতে তারপরও নতুন কেউ না কেউতো আসছে টিকে থাকার মত’।
বর্তমানে ফেসবুকের কারণে যেন মডেলের মহামারি চলছে দেশে। প্রযুক্তির কল্যাণে সবাই বড় বড় মডেল। অনেকেই ফেসবুকে তাদের পেশার জায়গায় লিখে রাখেন- মডেল। খোঁজ নিলে দেখা যায়, বন্ধু-বান্ধবের ক্যামেরায় তোলা ছবি দেখেই নিজেই নিজেকে মডেল হিসেবে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন। আর কিছু কিছু ফেসবুকের মডেল আছেন তারা কখন কোন পণ্যের মডেল হয়েছেন তা মনেও করতে পারেন না। কেউ আবার এমন এমন ব্রান্ডের মডেল বলে দাবি করে থাকেন, সে সব ব্রান্ডের কর্ণধার কিংবা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে দেখা যায়, তারা ওই মডেলের নামও শুনেননি কখনও। ফেসবুকের এসব মডেলের বেশিরভাগ আত্মপ্রচারণায় মশগুল থেকে নিজেকে তারকা বানানোর হেন চেষ্টা নেই যে করেন না। মডেলরা জানেন না যে- তারকা হওয়া যায় না। তারকা আপনা আপনি হয়। দর্শকের ভালোবাসা একজন মডেলকে রাতারাতি তারকা বানায়। এখানে কোনো কৌশলের স্থায়িত্ব নেই। যে কারণে বিগত এক যুগের বেশি সময় ধরে অনেক বিজ্ঞাপনের অনেক মডেলই তারকা হতে পারছেন না। এর ভেতরেও যেসব মডেল কিছুটা খ্যাতি পান, তারা কিন্তু নোবেল-মৌদের মতো তারকা মডেল হতে পারেন না।
বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের টিভি বিজ্ঞাপন নির্মিত হয়। কাজেই নানা ধরনের চেহারার উপস্থাপনাও দেখা যায়। কিন্তু বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত মডেল তারকা তাদেরকেই বলা হয় যারা প্রকৃত গ্ল্যামার মডেল। বাংলাদেশে যেসব মডেল তারকাখ্যাতি পেয়েছে তাদের ছাড়া মিডিয়া এখনো অচল প্রায়। কিন্তু সেই তারকা মডেল ক্ষরায় ভুগছে মিডিয়া। এটা দুঃখজনক। তবুও চোখ পাতলেই মনে হয় যেন, রাজধানীর ঘরে ঘরে হাজারো মডেল। আসলে কি তারা মডেল? নাকি অন্যকিছু?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *