বনশ্রীর ঘটনায় হত্যাসহ দুটি মামলা

টাইমস আই বেঙ্গলী ডকটম, ঢাকা: রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় গৃহকর্মী লাইলী বেগমের (২৫) রহস্যজনক মৃত্যু, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার গৃহকর্তা মইনুদ্দিন ও বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক টিপুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। খিলগাঁও থানার কর্তব্যরত কর্মকর্তা মো. মনসুর আহমেদ জানান, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে একটি হত্যা মামলা ও হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় আরেকটি মামলা হয়। গৃহকর্তা মইনুদ্দিন ও বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক টিপুকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে তিনি জানান। শুক্রবার বনশ্রীর বি ব্লকের ৪ নম্বর সড়কে একটি বাসায় গৃহকর্মী লাইলী বেগমের (২৫) রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। লাইলীকে হত্যার অভিযোগ এনে তাঁর পরিবার ও এলাকার বিক্ষুব্ধ লোকজন ওই বাড়িতে হামলা চালায় ও সড়কে গাড়ি ভাঙচুর করে। দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে স্থানীয়দের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কয়েক দফা ফাঁকা গুলি ছোড়ে। রাত ১০টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।
লাইলীর জা শাহনাজ পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, লাইলীকে হত্যা করা হয়েছে। গৃহকর্তা মইনুদ্দিন বলছেন, লাইলী বাসায় কাজ করতে আসার পর বাড়ির একটি ঘরে ঢুকে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেন। পরে দরজার ছিটকিনি ভেঙে ঘরের ভেতরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় লাইলীকে পাওয়া যায়।

 

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, খিলগাঁও থানাধীন দক্ষিণ বনশ্রীর একটি বাড়িতে মুন্সি মঈনুদ্দিনের ফ্ল্যাটে কাজ করতেন লাইলি বেগম। বাড়িটির মালিক মঈনউদ্দিন কাস্টমসের একজন অফিসার। শুক্রবার সকাল ১০ টার দিকে ফ্ল্যাটের একটি বেডরুমে লাইলিকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান বাড়ির লোকজন। অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড অভিযোগ করে এলাকাবাসী মঈনউদ্দিনের বাড়িটি ঘেরাও করে। তারা বিক্ষোভ করতে থাকে। বাড়িটির সামনের নিচতলায় এবং জানালার কাঁচে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। এসময় বিক্ষুব্ধ জনতাকে পুলিশ সেখান থেকে সরে যেতে বললে তাদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। বিক্ষুব্ধরা একটি প্রাইভেট কারে আগুন এবং দু’টি গাড়িতে ভাংচুর করে।
স্থানীয় বাসিন্দা বিপ্লব হোসেন জানান, ওই গৃহকর্মীকে বাড়ি থেকে অচেতন অবস্থায় বের করতে দেখেন এলাকাবাসী। তখন এলাকায় কে বা কারা গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, লাইলিকে হত্যা করা হয়েছে। এসময় স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে বাড়িটি ঘেরাও করে ভাংচুর শুরু করে। বাড়িটির পাঁচতলার গৃহকর্মী রুবি বেগম জানান, ২ বছর আগেও তিনি মঈনউদ্দিনের বাড়িতে কাজ করতেন। বেতনের কথা বললে তাকে টাকা চুরির মামলার হুমকি দেয়া হতো। তিনি আরও জানান, নিহত লাইলি বেগমের পাঁচ বছর বয়সী এক মেয়ে ও আড়াই বছরের এক ছেলে আছে। নিহত লাইলির স্বামী নজরুল ইসলাম একটি মামলায় কারাগারে আছেন। স্থানীয়রা এ ‘হত্যাকা-ে’র বিচার দাবি করেন। নিহত লাইলি বেগমের গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার জেলার ফুলপুর উপজেলার আজুয়াটারী এলাকায়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায় সাংবাদিকদের জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। এ ঘটনায় বাড়ির মালিককে আটক করা হয়েছে। নিহতের লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাবার পর জানা যাবে যে, কিভাবে তার মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরও জানান, পুলিশ স্থানীয় জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। তারাই জনতার আক্রমনের শিকার হয়েছেন। এতে পুলিশের কয়েকজন আহতও হয়েছেন। কৃষ্ণ পদ রায় আরও বলেন, পুলিশ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে এবং পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ঘটনাস্থলে মোতায়েন থাকবে।
এদিকে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, লাইলিকে হাসপাতালে নেয়ার পর সেখানে মঈনউদ্দিন বলেন, লাইলি সকালে তার বাসায় গিয়ে একটি কক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেয়। ডাকাডাকি করে দরজা না খোলায় পরে দরজা ভেঙে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। মঈনউদ্দিনের দাবি, লাইলি আত্মহত্যা করেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) বাচ্চু মিয়া জানান, সকালে ওই গৃহকর্মীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
সকালে হাসপাতালে বাড়ির গৃহকর্তা মইনুদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, তিনি পরিবার নিয়ে এই বাসায় (বনশ্রীর বি ব্লকের ৪ নম্বর সড়কে) থাকেন। লাইলী তাঁর ফ্ল্যাটে প্রতিদিনের মতো শুক্রবার সকালে কাজ করতে আসেন। ফ্ল্যাটে ঢুকেই একটি কক্ষের ভেতর গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। এ সময় ডাকাডাকি করলেও লাইলী দরজা খুলছিলেন না। তখন বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক টিপুকে জানানো হয়। একপর্যায়ে দরজার ছিটকিনি ভেঙে কক্ষটির ভেতরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় লাইলীকে পাওয়া যায়। সেখান থেকে উদ্ধার করে তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়। মইনুদ্দিন জানান, লাইলী বনশ্রীর পাশে হিন্দুপাড়া বস্তিতে দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে থাকতেন। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়িয়া উপজেলার আজুয়াটালী গ্রামে তাঁর বাড়ি। লাইলীর স্বামী নজরুল ইসলাম ভারতের কারাগারে বন্দী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *