প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে আ’লীগের যত বিষোদগার!

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: বিচারপতিদের অপসারণ করার ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করা সম্বলিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে সরকারি দল আওয়ামী লীগ নেতাদের তোপের মুখে পড়েছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।গত ১ আগস্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগ নেতারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে নানা অশালীন মন্তব্য করেছেন। ২২ আগষ্ট আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, শপথ ভঙ্গ, সংবিধান লঙ্গন ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে পদত্যাগ করা উচিত। প্রধান বিচারপতি তার আসনকে কলংকিত করেছেন মন্তব্য করে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কারণে উপজাতীয় ও সংখ্যালঘু থেকে প্রথম প্রধান বিচারপতি হয়েছেন এস কে সিনহা। প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ্য করে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘আপনি রায়ের পর্যবেক্ষণে বর্তমান সংসদকে অপরিপক্ক বলেছেন অথচ এই সংসদই আপনার বেতন-ভাতা মঞ্জুর করেছে। আমি অনুরোধ করবো আপনার রায়ের পর্যবেক্ষণের প্রতি সম্মান রেখে এ যাবত আপনি যে বেতন ভাতা গ্রহন করেছেন সমস্ত বতেন-ভাতা ফেরত দিন।
প্রধান বিচারপতি শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন জানিয়ে হাসান মাহমুদ বলেন, ২০১৪ সালে ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে মামলা চলাকালীন আপনি স্বীকার করেছিলেন ১৯৭১ সালে গ্রামেগঞ্জে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতাকারী শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। আপনি আজ পাকিস্তানের উদাহরণ টানছেন। আমাদের কাছে পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে লাভ নেই। এটি পাকিস্তান নয়। পাকিস্তানকে তাড়িয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে। আর এটি আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ জানে কেউ যদি দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে সেটি কিভাবে মোকাবেলা করতে হয়। দেশের মানুষ যখন স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ দিচ্ছিল তখন আপনি পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করেছিলেন। আপনার মতো মৌলভীবাজার কোর্টের আইনজীবীকে শেখ হাসিনাই প্রধান বিচারপতি বানিয়েছেন।
আদালত অনেক ধর্য্য ধরেছে-প্রধান বিচারপতির এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আওয়ামী লীগ অনেক ধৈর্য্য ধরেছে। দেশের মানুষও অনেক ধর্য্য ধরে আছে। দেশের মানুষের ধর্য্য বেশিদিন থাকবে না। আমি অতীতের উদাহরণ দিতে চাইনা। প্রধান বিচারপতির এজলাসে লাথি মারা হয়েছিলো, এখনো সেই ঘটনা ঘটেনি। সেই ঘটনা ঘটুক আমরা চাইনা। “বাংলাদেশে কামাল উদ্দিন হোসেনকে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে ড. এস কে মনিমকে প্রধান বিচারপতি করার পর তিনি এক বছর এজলাসে বসতে পারেননি। এজলাসে বসতে না পারা অবস্থাতেই প্রধান বিচারপতির পদ থেকে তাকে বিদায় নিতে হয়েছে। আমরা চাই না দেশে সে ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক।
১৯ আগস্ট খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছেন, আমার খুব ভয় হচ্ছে। আমি ভরসা পাচ্ছি না। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ের মতো আরেকটি বড় আঘাত আসতে পারে। আমার মনে হচ্ছে, জিয়ার মতো সিনহাও একই রূপ ধারণ করছেন। আজ তিনি (প্রধান বিচারপতি) বিচারপতি নিয়োগে আইনের কথা বলছেন। তার মনে রাখা উচিত যে, রাজনৈতিক বিবেচনাতেই তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।
গত ২২ আগস্ট প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার উদ্দেশে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেছেন, ‘পাকিস্তানের প্রতি যদি আপনার এত দরদ, অনুরাগ থাকে; তাহলে পাকিস্তান চলে যান। কেউ তো আপনাকে নিষেধ করছে না, সেই অধিকার আপনার আছে।’
হানিফ বলেন, ‘আপনি (প্রধান বিচারপতি) নিজেই বলেছিলেন যে আপনি শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। এর দ্বারা আপনি কি বোঝাতে চেয়েছিলেন? রাজাকার, শান্তি কমিটির সদস্যরা তো পাকিস্তানের সৈনিক ছিল; তাদের জনগণ বাংলার মাটিতে দেখতে চায় না।’ তিনি বলেন, ‘বাংলার জনগণ রুখে দাঁড়ালে অনেকেই পালাবার পথ পাবে না।’
২৪ আগস্ট শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি যাদের খুশি করার জন্য এসব কথা বলছেন তারা আপনার বন্ধু নয়, শত্রু। তাদের চিহ্নিত করুন। বঙ্গন্ধুর নেতৃত্বেই আমরা দেশ স্বাধীন করেছি।
আমু বলেন, প্রধান বিচারপতি হঠাৎ করেই সংসদ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করছেন। তাকে মনে রাখতে হবে আওয়ামী লীগ ঠুনকো দল নয়। কোনো সামরিক জান্তার পকেট থেকে এ দলের সৃষ্টি হয়নি।
২২ আগস্ট সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের ষোড়শ সংশোধনী রায়ের পর বিএনপির নেতারা যেভাবে বক্তব্য দিচ্ছেন তাতে মনে হচ্ছে তারাই প্রধান বিচারপতির মুখপাত্র।
গত ২১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন,প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সবকিছু সহ্য করা যায়। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা আমরা সহ্য করব না। পাকিস্তানের (সুপ্রিম কোর্টের) দেওয়া রায়ের কথা বলে কেউ আমাকে হুমকি দিয়েছেন… আমি তার জন্য জনগণের কাছে বিচার চাই। কেন পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করা হলো? আমাকে এসব হুমকি দিয়ে কোনো কাজ হবে না।
বিচারকদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, জাতীয় সংসদের সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। জনগণই এই প্রজাতন্ত্রের মালিক। সংসদ সদস্যরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন এবং প্রেসিডেন্ট প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়োগ দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *