আবদুল জব্বারের শেষ সাক্ষাৎকার

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: ষাট ও সত্তর দশকের জনপ্রিয় শিল্পী, আবদুল জব্বার। অসাধারণ যার কণ্ঠ এবং গায়কী। অনেক চমৎকার গান নিঃসৃত হয়েছে এ পর্যন্ত তার কণ্ঠ থেকে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ‘সালাম সালাম হাজার সালাম সকল শহীদ স্মরণে’,সহ অসংখ্য জনপ্রিয় ও কালজয়ী গানের সষ্টা জীবন্ত কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী মোহাম্মদ আবদুল জব্বার। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এ শিল্পীর গাওয়া বিভিন্ন গান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা ও মনোবল বাড়িয়েছে। তার গান জুগিয়েছে অদম্য সাহস, উজ্জীবিত করেছে বাঙালি জাতিকে। ১৯৭১ সালে তিনি মুম্বাইয়ে ভারতের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জনমত তৈরিতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। পরে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এবং আগরতলায় বেতারের কেন্দ্রীয় শাখাতে এসেও গান করতেন। বাংলা চলচ্চিত্রের অনেক জনপ্রিয় গানের শিল্পী তিনি। চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাক করেন ১৯৬২ সালে এবং ১৯৬৪ সালে বিটিভির নিয়মিত শিল্পীতে পরিণত হন। তুমি কি দেখেছ কভু, জীবনের পরাজয়, ‘পিচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি’, ‘তারা ভরা রাতে তোমার কথা যে মনে পড়ে বেদনায় গো’, এমন অনেক জনপ্রিয় গান তিনি উপহার দিয়েছেন শ্রোতাদের। জীবন্ত কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার ১০৭৩ সালে ‘বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক’, ১০৮০ সালে একুশে পদক, ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পদক, জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ ছোট বড় আরও অনেক সম্মাননা লাভ করেছেন। তার ক্যারিয়ারের নানা কথা জানিয়েছিলেন একান্ত সাক্ষাৎকারে।

►আপনাকে আগের মতো সঙ্গীতে পাওয়া যায় না কেন?
►►আগের সময় আর এখনকার সময়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য। আগে আমাদের শিল্পী হিসেবে মূল্যায়ন করা হতো। এখন আমাদের ডাকা হয় না। আমরা চাইলেও গান গাইতে পারি না। এটি অবশ্যই আমাদের জন্য দুঃখজনক বিষয়। এখন অনেক টিভি চ্যানেল হয়েছে, আমরা উঠে এসেছি একটিমাত্র টিভি চ্যানেল ও রেডিওর মাধ্যমে। প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে চারটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতাম। কিন্তু এখন কোনো চ্যানেলে আমাদের দিয়ে কোনো অনুষ্ঠান করা হয় না। ভালো চেহারা দেখে অনুষ্ঠানে ডাকা হয়। অনুষ্ঠানের নামে তারা কি করেন তারাই বলতে পারেন। বলা যায় এক ধরনের অভিমান থেকেই গান করা হয় না। আর সে জন্যই আমাকে আগের মতো পাওয়া যায় না।

ক্যারিয়ার শুরু থেকেই বেশি বেশি দেশাত্মবোধক গান গেয়েছেন কেন?
►►আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। অনেক স্মৃতি আজও আমার চোখের সামনে ভাসে। কোটি মানুষের রক্তের বিনিময় আজ আমাদের বাংলাদেশ। সে সময় আমরা যারা গান করতাম সবাই খুব কষ্ট করে গান গাইতাম। সে সময় থেকে দেশাত্মবোধক গান করি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আমার গাওয়া গান দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। সে অনুপ্রেরণা থেকেই অথবা দেশপ্রেমও বলতে পারেন। সে জায়গা থেকেই দেশাত্মবোধক গান করি।

►সে সময়কার কোনো স্মৃতি আজও মনে পড়ে। যা আপনাকে হৃদয় স্পর্শ করে?
►►স্মৃতি তো অনেক আছে। তবে সে সময়কার সবচেয়ে বেশি যেটি মনে পড়ে, রাতের পর রাত অনেক কষ্ট করেছি। না খেয়ে থেকেছি, কিন্তু আমরাও কেউও গান বন্ধ করিনি। এক দিকে মনের শংকা কি ঘটতে পারে, অন্যদিকে গানকে জেনেছি ধ্যান-জ্ঞান। চোখ বন্ধ করলেও সে সময়কার স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে আসে।

►বর্তমানে সঙ্গীতের ব্যস্ততা কী নিয়ে?
►►সঙ্গীতের ব্যস্ততা এখন নিজেকে নিয়েই। নিজের ইচ্ছা মতো নিজের জন্যই গান করি। অনেকে ভাবেন এখন হয়তো গান করি না। এ ধারণাটি ভুল। দেশে এখন গুণী শিল্পীদের কদর করা হচ্ছে না।

►বর্তমান প্রজন্মের গান নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
►►আমাদের সময় আমরা যা গাইতাম তা দিয়ে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানো যেত। এখনকার ছেলেমেয়েরা কি গান গায় তা তারা নিজেও জানে না। এক কথায় একাল আর সেকালের কোনো মিল খুঁজে পাই না। তাদের ভালো কণ্ঠ আছে, কিন্তু তারা যে ধরনের গান গায় আমাদের দেশের মানুষ তা শুনতে চায় না।

►তাহলে দুর্বলতাগুলো কোথায়?
►►এখনকার গানের কথা, সুর- কোনোটিরই কোনো অর্থ থাকে না। শ্রোতারা গানের কোনো অর্থ ও সুর কিছুই খুঁজে পাব না।

►এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
►►পরিত্রাণের উপায় থাকলেও নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা তা গ্রহণ করেন না। কারণ তারা নিজেকে অনেক বড় শিল্পী ভাবেন। তারপর তাদের এটুকু বলব, আপনারা ভালো গান করেন। কিছু সময়ে আনন্দ না দিয়ে শ্রোতাদের মানসম্মত গান উপহার দিন। আপনাদের উচিত গান শিখে গান করতে আসা।

►একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের প্রতি কতটুকু দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন?
►►আমরা দায়িত্ব পালন করতে চাই। কিন্তু আমাদের তা পালন করতে দেয়া হচ্ছে না। কারণ আমরা এখনও গান করতে চাই। শ্রোতারা চায় আমরা মানসম্মত গান উপহার দিই। দেশের প্রতি আমাদের শিল্পী সমাজের এটাও দায়িত্ব। কিন্তু আমরা তা পালন করতে পারছি কোথায়।

►দেশের একজন স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিল্পী হিসেবে আপনাকে কতটুকু মূল্যায়ন করা হয়েছে বলে মনে করেন?
►►জাতি এবং সরকার আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু এভাবে চলে না। সে বিষয় এখন কোনো অনুভূতি নেই। কারণ মিডিয়া এখন আর আমাদের দিয়ে অনুষ্ঠান করায় না। শিল্পীদেরও সংসার আছে। আমাদেরও খেয়ে পরে ভদ্রভাবে বেঁচে থাকতে হয়। কোনো স্বীকৃতির জন্য নয়, আমরা সঙ্গীতকে বাঁচিয়ে রাখতে এখনও গান করি।

►বর্তমান চলচ্চিত্রের গান নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
►►চলচ্চিত্রের গানের কথা আর কি বলব। গত দুই বছরে আমি এমন একটি গানও পাইনি যা দিয়ে একটি ছবি হিট করানো যায়। কে বা কারা এমন গান করান আর চলচ্চিত্রে এসব গান ব্যবহার করা হয় ভাবতে অবাক লাগে। এগুলো কোনো গানের মধ্যেই পড়ে না।

►আপনার সঙ্গীত জীবনে সবচেয়ে বড় অর্জন কী?
►►আমার সঙ্গীত জীবনের প্রাপ্তিটা অনেক বিশাল। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্জন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছিলাম। সে সময় তিনি আমাকে বলেছিলেন, তোমার বিখ্যাত হওয়ার দরকার নেই, তুমি গান করে যাও। তোমাকে আমি আজ জাতীয় গায়কের মর্যাদা দিলাম। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

►সঙ্গীত জীবনে আপনার কোনো অপ্রাপ্তি আছে কি?
►►সব প্রাপ্তির মধ্যেও কিছু অপ্রাপ্তি থাকে। আমার সবচেয়ে বড় অপ্রাপ্তি গান গেয়ে নিজে তৃপ্ত হতে পারলাম না। জানি না এ আক্ষেপটা কোনো দিন ভুলতে পারব কিনা।

►অ্যালবাম প্রকাশ করা নিয়ে কিছু ভাবছেন?
►►অ্যালবাম কীভাবে করব। একটি বড় প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করতে হলে অর্থনৈতিক দিক সম্পর্কে ভাবতে হয়। অ্যালবাম বের করলে কোম্পানিগুলো আমাদের যথাযথ সম্মানী দেয় না। তাই ইচ্ছা থাকলেও কোনো প্রজেক্টের কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু আমাদের গান দিয়ে কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা ব্যবসা করছে।

►সঙ্গীত নিয়ে আপনার আগামী দিনের ইচ্ছী কী?
►►শ্রোতারা আমাদের গান শুনতে চান, তাই আমরা গান গাইতে চাই। ব্যক্তিগভাবে আমি গান নিয়ে আছি। যত দিন বাঁচব অর্থের জন্য নয়, শ্রোতাদের ভালোবাসার জন্যই গান করব।

সূত্র: যুগান্তর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *