হাসপাতালেই ঈদের নামাজ পড়লেন সিদ্দিকুর

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই এবারের ঈদ কাটাতে হচ্ছে পুলিশের টিয়ারসেলে দৃষ্টিশক্তি হারানো তিতুমীর কলেজের ছাত্র সিদ্দিকুর রহমানকে। শনিবার সকালে হাসপাতালের মসজিদেই ঈদের নামাজ আদায় করেন তিনি। এরপর বেডে শুয়ে অলস সময় পার করছেন আর স্মৃতিচারণ করছেন তার জীবনের কেটে যাওয়া বিগত ঈদগুলোর। সিদ্দিকুরের বন্ধুরাও ঈদ করতে বাড়িতে গেছেন। কিন্তু যাওয়ার আগে সিদ্দিকুর ও তার মায়ের জন্য কেনাকাটা করে দিয়ে গেছেন। ঈদের দিন সকালে বন্ধুদের উপহার দেওয়া পাঞ্জাবিই পরেছেন সিদ্দিক। তার মা ছোলেমা খাতুনও ছেলের বন্ধুদের দেওয়া শাড়ি পরে তাদের করা বাজার দিয়ে ভালমন্দ রান্না করেছেন হাসপাতালেই।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সঙ্গে আলাপকালে সিদ্দিকুর বলেন, ‘প্রতি ঈদেই আমি গ্রামে যেতাম। আর কারো জন্য কিছু কিনতে না পারলেও ভাতিজা লাবিব ও দুই ভাতিজি নীলা ও শীলার জন্য নতুন জামা কিনে নিয়ে যেতাম। তারাও প্রতি ঈদেই আমার জন্য অপেক্ষা করতো।’ সিদ্দিক বলেন, ‘তাদের সব আবদার ছিল আমার কাছে। ওদের আমি সবচেয়ে বেশি মিস করি। গত ঈদেও ওদের জন্য কেনাকাটা করে বাড়ি গিয়েছিলাম। কত খুশি হয়েছিল। গত ঈদেই আমার প্রিয় মুখগুলোকে শেষ দেখেছিলাম। ওই প্রিয়মুখগুলো আর দেখতে পারব না সেটা ভাবলেই খুব কষ্ট হয়।’
অশ্রুসজল নয়নে তিতুমীর কলেজের এ ছাত্র আরো বলেন, ‘এবার ঈদেও ভাতিজা-ভাতিজিরা আমার বড় ভাইয়ের কাছে একটাই প্রশ্ন করছে। চাচ্চু কি সুস্থ হবে না? আমাদের জন্য নতুন জামা কিনে বাড়িতে আসবে না? আমরা কবে দেখব চাচ্চুকে?’
কাঁদতে কাদঁতে সিদ্দিক বলেন, ‘মাকে বলেছিলাম আমাকে দুইটা বছর সময় দাও। আমি লেখাপড়া শেষ করে তোমাদের জন্য কিছু একটা করব। তিন বছর বয়সে আমার বাবা মারা যান। অনেক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে সময় গেছে। আমার বড় ভাই মেট্রিক পাস করে পড়ালেখা ছেড়ে দেন। তিনি লেবারের কাজ করে আমাকে লেখাপড়া করিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘বড় ভাই সামান্য যে টাকা পান প্রথমে এসেই সেটা আমার হাতে দেন। বলেন, ‘‘ভাই তোর কতে টাকা লাগব তুই রাখ। পরে আমি বাকিটা সংসারে খরচ করব।’’ গত ঈদেও তিনি তার ছেলে মেয়ের জন্য একটা সুতাও কেনেননি। কিন্তু আমার জন্য একটা টিশার্ট কিনেছেন। তিনি এতোটাই ভালবাসেন আমাকে। আমি কীভাবে এ বড় ভাইকে সাহায্য করব? কীভাবে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেব?’
১৯৯৪ সালে মাত্র তিন বছর বয়সে সিদ্দিকুরের বাবা তহুর উদ্দিন মারা যান। এরপর বিধবা মা ছোলেমা খাতুন কিষাণির কাজ করে ছেলেদের লেখাপড়া করান। কিন্তু মাধ্যমিক পাস করার পর অভাবের সংসারের কথা ভেবে পড়ালেখা ছেড়ে দেন বড় ভাই নায়েব আলী। হাল ধরেন সংসারের। শ্রমিকের কাজ করে সংসারের পাশাপাশি সিদ্দিকুরের পড়ালেখার খরচ জোগাতে থাকেন।
সিদ্দিকুর স্থানীয় পশ্চিম ঢাকেরকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৭ম শ্রেণি পাস করে ময়মনসিংহ শহরের কৃষ্টপুর আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও আলিমে জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করেন। এরপর রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হন ঢাকার তিতুমীর কলেজে। খিলক্ষেতে মেসে থেকে টিউশনি ও একটি দোকানে কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচ যোগাতেন সিদ্দিক।
পরীক্ষার রুটিন ও তারিখ ঘোষণাসহ কয়েকটি দাবিতে ২০ জুলাই সকাল ১০টার দিকে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়া সাতটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা। পুলিশ তাদের ওই জায়গা ছেড়ে যেতে বললে তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুট ওভার ব্রিজের পাশের অংশে অবস্থান নেন। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এ সময় সিদ্দিকুর রহমানের দু’চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে তাকে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চেন্নাই পাঠানো হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পরও সিদ্দিকের চোখের আলো ফেরানো যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *