দারুস সালামে জঙ্গি আস্তানায় বিস্ফোরণে ভবনে আগুন

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: রাজধানীর দারুস সালামে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে ঘিরে রাখা বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটেছে। মঙ্গলবার রাত ৯টা ৪৬ মিনিটে পরপর চারটি বোমা বিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে জঙ্গি আস্তানাটি। এতে ভবনে আগুন ধরে যায়। এ সময় একাধিক গুলির শব্দও শোনা যায়। পরে র‌্যাব পাল্টা গুলি ছুড়ে ভবনের চারপাশে অবস্থান নেয়। রাত ১০টা ৩৭ মিনিটে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান সাংবাদিকদের জানান, বিস্ফোরণের ঘটনায় স্পি­ন্টারবিদ্ধ হয়ে র‌্যাবের চার সদস্য আহত হয়েছেন। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চিকিৎসকরা তাদের আশঙ্কামুক্ত ঘোষণা করেছেন।
মুফতি মাহমুদ খান জানান, বিস্ফোরণের ঘটনায় ছয় তলা ভবনের পাঁচ তলার জানালার গ্রিল ও বারান্দা উড়ে গেছে। ভেতরে থাকা দুর্ধর্ষ জঙ্গি আবদুল্লাহসহ অন্যদের কী অবস্থা তা এখনও জানা যায়নি। রাত ১২টার দিকে র‌্যাব পরিচালক বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। আপাতত বাড়িটি ঘিরে রাখা হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে ফের অভিযান চালানো হবে। তখন বাড়ির ভেতরের প্রকৃত অবস্থা বা হতাহতের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এর আগে দুপুরে র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই বাড়িতে জঙ্গি আবদুল্লাহ অবস্থান করছে। আবদুল্লার দুই সহযোগী, দুই স্ত্রী এবং দুই সন্তান ওমর (১০) ও ওসামা (আড়াই বছর) সেখানে রয়েছে। তখন র‌্যাব আরও জানায়, আস্তানায় পিস্তল, বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, এসিড এবং আইইডি (ইম্প্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) রয়েছে। ব্যবসার আড়ালে আবদুল্লাহ ওই বাড়িতে বোমা তৈরির কাঁচামাল মজুদ করেছে। সোমবার গভীর রাত থেকে বাড়িটি ঘিরে রাখে। মঙ্গলবার সকাল থেকে আশপাশের এলাকা ঘিরে ফেলা হয়।
আবদুল্লাহকে আত্মসমর্পণ করাতে মঙ্গলবার দিনভর দফায় দফায় চেষ্টা করে র‌্যাব। সর্বশেষ সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে আবদুল্লাহ আত্মসমর্পণ করবে বলে র‌্যাবকে জানায়। রাত ৮টার দিকে জঙ্গি আবদুল্লাহ র‌্যাবকে জানায়, তারা এশার নামাজ আদায়ের পর আত্মসমর্পণ করবে। দারুস সালাম থানা এলাকায় মাজার রোডের পাশে বর্ধনবাড়ী ভাঙা ওয়ালের গলির ২/৩-বি হোল্ডিংয়ে ছয় তলা ওই বাড়িটির অবস্থান। বাড়ির মালিক হাবিবুল্লাহ বাহার আজাদ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তিনি নিজেও পরিবার নিয়ে ওই বাড়িতে থাকেন। পুরো এলাকা র‌্যাব ঘিরে রাখায় স্থানীয় বাসিন্দারা মঙ্গলবার দিনভর এক প্রকার বন্দি অবস্থা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটান। যে বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায়, তার ৫০ গজ সামনেই পুলিশের সহকারী কমিশনারের অফিস। এর পাশেই দারুস সালাম থানা।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে র‌্যাব লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান সাংবাদিকদের জানান, সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে জঙ্গি আবদুল্লাহ আত্মসমর্পণ করবে। এ সময় র‌্যাবের প্রশ্ন ছিল- ‘আপনি যে আত্মসমর্পণ করবেন তা কিভাবে বিশ্বাস করব?’ এর উত্তরে আবদুল্লাহ র‌্যাবকে বলে, ‘আমি আমার স্ত্রী-সন্তানকে বারান্দায় পাঠাচ্ছি। তারা আপনাদের সঙ্গে কথা বলবে।’ এরপর আবদুল্লাহর এক স্ত্রী ও এক সন্তান বারান্দায় এলে র‌্যাবের সঙ্গে ইশারা ইঙ্গিতে তাদের কথা হয়। এ সময় তারা ওই বাড়িতে পাঁচজনের অবস্থান করার বিষয়টি র‌্যাবকে জানায়। এর আগে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে এক ব্রিফিংয়ে র‌্যাবব মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ জানান, ছয় তলা বাড়ির পঞ্চম তলার ওই ‘জঙ্গি আস্তানায়’ নারী-শিশুসহ সাতজন আছে। আবদুল্লাহকে দুর্ধর্ষ জঙ্গি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে আবদুল্লাহর দুই স্ত্রী, দুই সহযোগী ও দুই সন্তান রয়েছে।
এক সন্তানের বয়স ১০ বছর এবং অন্য সন্তানের বয়স আড়াই বছর। বাড়িটির ২৪টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ২৩টি থেকে পুরুষ-নারী-শিশুসহ ৬৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ শিশু, ২৪ নারী ও ২৬ জন পুরুষ। ভবনের বাসিন্দাদের উদ্ধারের পর বাড়িটির গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়।
র‌্যাব ডিজি বলেন, সোমবার রাতে টাঙ্গাইলে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রসহ দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায়। সকালেই আবদুল্লাহর বাকপ্রতিবন্ধী বোন মেহেরুন্নেছা আত্মসমর্পণ করে। পরে মেহেরুন্নেছাকে দিয়ে আবদুল্লাহকে আত্মসমর্পণ করানোর চেষ্টা করা হয়। আবদুল্লাহকে আত্মসমর্পণ করানোর জন্য ফোনে বারবার যোগাযোগ করা হলেও সে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। সংবাদ সম্মেলনে বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আমরা চাইলেই অপারেশন শুরু করতে পারি।
আমাদের ১০-১৫ মিনিটের বেশি লাগবে না। কিন্তু কোনো নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি চাই না। সেখানে নারী ও শিশু রয়েছে। তাই তাকে (আবদুল্লাহ) আত্মসমর্পণের অনুরোধ করছি।’ তিনি জানান, আস্তানায় প্রচুর বিস্ফোরক রয়েছে। এসবের মধ্যে এসিড, পেট্রুল ও ৫০টির বেশি আইইডি আছে।সেখানে রাতে বিস্ফোরণ ও গুলির ঘটনা ঘটে। আবদুল্লাহর কাছে পিস্তলও থাকতে পারে। বেনজীর আহমেদ জানান, ওই বাড়ি ঘিরে ফেলার পর রাত ১টার দিকে বাড়ির ভেতর থেকে চারটি বোমা ছোড়া হয়। সেখান থেকে ছোড়া বোমার মধ্যে পেট্রুলবোমাও ছিল। সেগুলো বাইরে পড়ার পর আগুন ধরে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে বাড়ির সামনে পানি ছিটান। র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, আবদুল্লাহ ২০০৫ সাল থেকে জঙ্গিবাদে জড়িত। ১০-১২ বছর ধরে সে এই এলাকায় বসবাস করছে।
কবুতরের ব্যবসার পাশাপাশি সে আইপিএস, ইউপিএস এবং ফ্রিজের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আইপিএস ও ইউপিএস ব্যবসার আড়ালে বাড়িটিতে সে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও দাহ্য পদার্থ মজুদ করে। র‌্যাবের ধারণা, আবদুল্লাহ নব্য জেএমবি সারোয়ার তামিম গ্রুপের সদস্য।
আবদুল্লার পরিচয় : পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, আবদুল্লাহর গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার আলোকদিয়ায়। তার বাবা মৃত মীর ইউসুফ আলী। দারুস সালাম থানার ওসি সলিমুজ্জামান জানান, ২০০৩ সাল থেকে আবদুল্লাহ এ এলাকায় ভাড়া থাকে। ভাড়াটিয়া তথ্য ফরমে তার বিষয়ে যাবতীয় তথ্য রয়েছে। যে বাসাটিতে আস্তানার সন্ধান পাওয়া গেছে সেখানে আবদুল্লাহ ৮-১০ বছর ধরে ভাড়া থাকে। জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে তার বিশেষ সখ্য রয়েছে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়।
বাড়িওয়ালার পরিচয় : স্থানীয় সূত্রের দাবি, বাড়ির মালিক হাবিবুল্লাহ বাহার আজাদ টেলিফোন এক্সেচেঞ্জের কর্মচারী হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ঝিনাইদহের শৈলকূপায় তার বাড়ি। ২০০৯ সালের আগে তিনি জামায়াতে ইসলামীর রোকন ছিলেন বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেন। স্থানীয় বায়তুল জান্নাত জামে মসজিদ কমিটির সহ-সভাপতি আজাদ। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে টিএন্ডটি সিবিএ নেতা ছিলেন।
সরকারি বাংলা কলেজের ছাত্রলীগের সাবেক এক ভিপির হাত ধরে আওয়ামী লীগে তার উত্থান। ওই নেতার সঙ্গে তার ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বও রয়েছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
স্থানীয়দের ভাষ্য : অভিযান শুরুর পর সোমবার গভীর রাতে কমপক্ষে পাঁচটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। ওই বাড়ির বাসিন্দা শুলশান আরা বলেন, রাতে বোমা বিস্ফোরণের বিকট শব্দে তাদের ঘুম ভাঙে। তিনিসহ বাসায় তার স্বামী ও দুই সন্তান ছিলেন। ভয়ে মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না। থরথর করে শরীর কাঁপছিল।
বিছানা ছেড়ে দ্রুত ফ্লোরে শুয়ে পড়ি। ভোরে র‌্যাব সদস্যদের ডাকে দরজা খুলে দ্রুত বের হয়ে আসি। প্রথমে স্থানীয় একটি স্কুলে আশ্রয় নিলেও পরে এক স্বজনের বাসায় উঠি।
জাতীয় পার্টির নেতা ও স্থানীয় বায়তুল জান্নাত জামে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাকুর রহমান মোস্তাক জানান, আবদুল্লাহ এ এলাকায় দীর্ঘ বছর ধরে বসবাস করছে। নিয়মিত নামাজ পড়ত সে। আচরণ ও চলাফেরা ভালো ছিল। তার মাথায় বাবরি চুল ও মুখে দাড়ি রয়েছে।
আইপিএস ও কবুতর ব্যবসায়ী ছিলেন আবদুল্লাহ। কিন্তু এসবের আড়ালে সে জঙ্গি কার্যাক্রম করত এটা আমরা ধারণাই করতে পারিনি।
স্থানীয় সাঈদ জানান, আবদুল্লার পারিবারিক ব্যবসা হল কবুতর লালন-পালন ও বিক্রি। সে নিজে বাসায় আইপিএস ও ইউপিএস বানাত। স্থানীয় মসজিদ কমিটির সঙ্গে আবদুল্লার একাধিকবার ঝামেলা হয়েছে। বাড়িওয়ালা আজাদ পক্ষে থাকায় তার (আবদুল্লাহ) বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
পরিবহন কর্মী শফিক বলেন, রাত ১টায় হঠাৎ বিকট শব্দ শুনি। এর পরপর আরও কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। চা দোকানদার আওলাদ হোসেন জানান, আবদুল্লাহ তার দোকানে চা খেত। আড্ডা দিত।
কখনও তাকে জঙ্গি বলে মনে হয়নি। বৃষ্টি হলেই ফুটবল নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। মহল্লার ছেলেদের নিয়ে পাশের মাঠে খেলত। ঘটনাস্থলের সামনের বাড়ির বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তানজীন বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই দেখছি আবদুল্লাহ ওই বাড়িতে থাকেন। কখনও ভাবিনি যে সে জঙ্গি হতে পারে।’ তিনি জানান, ওই বাড়িতে আবদুল্লাহ দুই স্ত্রী, দুই সন্তান ও ছোট ভাই খোকাকে নিয়ে থাকত। তার বোন ঈদে ওই বাসায় বেড়াতে এসেছিল।.
ইট ব্যবসায়ী আলমগীর বলেন, ‘জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে আবদুল্লার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আমি জানি। সে যখন-তখন যার-তার বাড়ির জানালা দিয়ে উঁকি দিত। এ নিয়ে এলাকায় একাধিকবার সালিশও হয়েছে। বারবার বাড়িওয়ালা আজাদ তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।’ তিনি জানান, ছয়তলা বাড়ির ছাদে কবুতর পালন করে আবদুল্লাহ। এর বিনিময়ে মোটা অংকের ভাড়া পান আজাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *