মায়ানমারে রাখাইন রাজ্যে এখনও আগুন জ্বলছে

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটকম, ঢাকা: মায়ানমারে রাখাইন রাজ্যে এখনও আগুন জ্বলছে। শুক্রবারও রোহিঙ্গাদের গ্রামে আগুন দিয়েছে দেশটির সেনা সদস্যরা। কমপক্ষে দুটি গ্রাম থেকে আগুনের লেলিহান শিখা এবং ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে এদিন কক্সবাজারের টেকনাফে ঢল নেমেছিল নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের। নাফ নদী পাড়ি দিয়ে শাহপরীর দ্বীপসহ পাঁচটি সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রায় সারা দিনই দলে দলে বাংলাদেশে ঢুকেছেন তারা। এদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে গ্রামের পর গ্রাম বিরানভূমিতে পরিণত করেছে বলে ‘অকাট্য প্রমাণ’ পেয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। একে ‘স্কর্চড আর্থ’ (পোড়ামাটি) কৌশল বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি। স্যাটেলাইট ছবির ভিত্তিতে অ্যামনেস্টি বলছে, মিয়ানমারে নিরাপত্তা বাহিনী জাতিগত নিধন চালাচ্ছে- যা মানবতাবিরোধী অপরাধ।
শুক্রবার ব্যাংককে এক অনুষ্ঠানে অ্যামনেস্টি এসব মন্তব্য করেছে বলে জানায় এএফপি। লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাটি জানায়, নতুন করে তারা যেসব স্যাটেলাইট ছবি পেয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে রাখাইনের অন্তত ২৬টি গ্রামে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। যেসব স্থানে এক সময় ঘরবাড়ি ছিল সেগুলোতে ধূসর ভস্ম দেখা যাচ্ছে।অ্যামনেস্টি বলেছে, স্যাটেলাইটে ফায়ার সেন্সর বসিয়ে তারা দেখতে পেয়েছে ২৫ আগস্ট থেকে উত্তর রাখাইনে ৮০ বার বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড দেখা গেছে। সেদিন থেকেই সেনাবাহিনীর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’ শুরু হয়।অ্যামনেস্টির গবেষক ওলফ ব্লোমভিস্ট বলেন, ‘রাখাইন জ্বলছে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী জাতিগত নির্মূল অভিযান চালাচ্ছে।’
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে অ্যামনেস্টি জানায়, নিরাপত্তা বাহিনী ও উগ্র জনতা পেট্রল কিংবা কাঁধেচালিত রকেট লঞ্চার ব্যবহার করে বাড়িতে আগুন দেয়। এরপর তারা পালিয়ে যায়। অনেক এলাকায় রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের লোকেরা বাস করলেও বেছে বেছে শুধু রোহিঙ্গাদের বাড়িতেই আগুন দেয়া হয়েছে।ব্লোমভিস্ট বলেন, ‘যে কোনো মূল্যে রোহিঙ্গাদের তাদের দেশ থেকে উচ্ছেদ করার মতলব থেকেই নিরাপত্তা বাহিনী এসব করছে বলে উপসংহারে পৌঁছানো কঠিন নয়।’
স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিগুলো প্রকাশ করে অ্যামনেস্টির পক্ষ থেকে বলা হয়, গত তিন সপ্তাহ ধরে সেখানে ‘খুবই পরিকল্পিতভাবে একটি নির্দিষ্ট ছকে গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেয়ার’ ছবি এখানে ওঠে এসেছে। অ্যামনেস্টির ক্রাইসিস রেসপন্স ডিরেক্টর তিরানা হাসান বলেন, ‘মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দেশ থেকে বিতাড়নের লক্ষ্য নিয়েই যে গ্রামগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে- এগুলো তার অকাট্য প্রমাণ। এটা জাতিগত নির্মূল অভিযান, এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।’
রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে হামলার বর্ণনায় অ্যামনেস্টির পক্ষ থেকে বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এক-একটি গ্রাম প্রথমে ঘিরে ফেলছে, পলায়নরত গ্রামবাসীর ওপর নির্বিচারে গুলি ছুড়ছে এবং তাদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এটা নিশ্চিতভাবেই ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’। ২৫ আগস্ট রাতে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) রাখাইন রাজ্যে এক সঙ্গে ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে হামলা চালায় বলে দাবি মিয়ানমার সরকারের। কথিত হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার পর থেকে রাখাইনে সেনা অভিযান চলছে। সেনাবাহিনী কিভাবে গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছে, ঘরের ভেতরে আটকে রেখে কিভাবে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, লুটপাট চালিয়ে কিভাবে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, সেই বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কথায়। মিয়ানমার সরকার দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য রোহিঙ্গারা নিজেরাই নিজেদের বাড়িতে আগুন দেয়। তবে মানবাধিকার সংগঠন ও প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকরা এ দাবি নাকচ করে দিয়েছেন।
পোড়ামাটি নীতি বা ‘স্কর্চড আর্থ’ কি : মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দেশটির মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের নির্মূলের জন্য ‘স্কর্চড আর্থ’ কৌশল অবলম্বন করছে। এ কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো একের পর এক জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং যারা পালাতে চাইছে তাদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। সামরিক পরিভাষায়, স্কর্চড আর্থ নীতি হচ্ছে একটি সামরিক কৌশল।
সহজ বাংলায় এটাকে পোড়ামাটি কৌশল বলা হয়। এ কৌশল অনুসারে সেনারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে এগিয়ে যাওয়ার সময় ‘শত্রু’ সেনাদের হত্যার পাশাপাশি সবকিছু পুড়িয়ে দেয়। ‘শত্রু’র পক্ষে ব্যবহার করা সম্ভব এমন স্থাপনা ও অবকাঠামো জ্বালিয়ে দেয়া হয়। যেমন- খাদ্যের উৎস, পানির সরবরাহ, পরিবহন, যোগাযোগ, শিল্প-কারখানা ইত্যাদি।
এই কৌশল সেনাবাহিনী ‘শত্রু’ ভূমিতে অথবা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ভূ-খণ্ডেও ব্যবহার করতে পারে। ‘শত্রু’র সম্পদ ধ্বংস করার কৌশলের চেয়ে স্কর্চড আর্থ ভিন্ন।
অতীতে রাশিয়ার সেনাবাহিনী এ কৌশল ব্যবহার করেছে বেশ কয়েকবার। মার্কিন গৃহযুদ্ধেও কৌশলটি ব্যবহৃত রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাবাহিনী সোভিয়েত অভিযানে এবং জাপান তার প্রতিবেশী চীনে এ কৌশল ব্যবহার করেছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে এ কৌশল ব্যবহার করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। গত কয়েক দশকের মধ্যে শ্রীলংকা, লিবিয়া ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধেও কৌশলটি ব্যবহার করা হয়েছে।
এখনও জ্বলছে রাখাইন : রাখাইনে এখনও আগুন জ্বলছে। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে শুক্রবার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামে আগুনের শিখা দেখা যায়। বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়েছে, রাখাইনের তামব্রু গ্রাম থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া কয়েকজন বাসিন্দা বলেছেন, কয়েক দিন আগে তারা এদেশে পালিয়ে এসেছেন এবং যেসব ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে সেগুলো তাদের।
এই গ্রামে ৬০০০ রোহিঙ্গা মুসলিমের বাস ছিল। গত তিন সপ্তাহে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। অনেক শরণার্থী বলেছেন, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধরা তাদের ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে বলে- ‘হয় চলে যা না হয় মর।’ এদিকে যুগান্তরের টেকনাফ প্রতিনিধি নুরুল করিম রাসেল জানান, রাখাইন অঞ্চলে প্রতিদিন কোনো না কোনো রোহিঙ্গা গ্রামে আগুন দিচ্ছে সেনাবাহিনী ও বিজিপি। শুক্রবার শায়রাপাড়া ও রাইম্যাবিল নামে দুটি গ্রামে আগুন দেয় তারা। ফলে সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গাদের আসা থামছে না।
শুক্রবার টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, নয়াপাড়া, নাইট্যংপাড়া, হোয়াইক্যং ও হ্নীলা সীমান্ত দিয়ে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে দলে দলে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ ঘটে। এদিন রাখাইনের নোয়াপাড়া, শায়রাপাড়া, ধামনখালী, শোয়াপ্রাং প্রভৃতি এলাকা থেকে রোহিঙ্গারা আসে।
বিধ্বস্ত রাখাইনে এখন কারা আছেন : সামরিক অভিযানের মুখে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যে ভয়াবহ মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তাতে এরই মধ্যে প্রায় চার লাখ শরণার্থী প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এএফপি জানায়, লাখো রোহিঙ্গা মুসলিমদের পাশাপাশি রাখাইনের প্রায় ৩০ হাজার হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীও গৃহহীন হয়েছে। তারা বলছে, রাখাইনের উত্তর দিকের যে এলাকা থেকে উত্তেজনার শুরু, প্রথম থেকেই তা ঘিরে রেখেছে সরকারি বাহিনী।
অন্যদিকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছে, সেনাবাহিনী ও সংঘবদ্ধ বৌদ্ধরা গ্রামের পর গ্রামে গণহত্যা চালিয়ে সেগুলো মুসলিমশূন্য করার পাশাপাশি গ্রামগুলোকে মাটির সঙ্গে মিশিয়েও দিচ্ছে। কঠোর সেনা অভিযানের মধ্যে লাখো রোহিঙ্গা দেশ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। তাহলে সহিংসতা বিধ্বস্ত রাখাইনে এখন থাকছে কারা? ২০১৫ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, রাখাইনে বাস করা ৩০ লাখ মানুষের মধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম। তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তরের জেলা মংডুতেই এক-তৃতীয়াংশের বাস বলে মিয়ানমার সরকার জানিয়েছে। গত তিন সপ্তাহে ওই মংডু জেলারই অন্তত ৪০ শতাংশ গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়েছে বলে সরকারের এক মুখপাত্র জানান।
গত কয়েক দিনে বাংলাদেশে যত শরণার্থী এসেছে তা মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গাদের প্রায় অর্ধেক বলে ধারণা করা হচ্ছে। মিয়ানমারের তথ্যবিষয়ক কমিটি বলছে, ৫৯টি গ্রামের প্রায় ৭ হাজার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই ‘বাঙালিদের’। রোহিঙ্গাদের এই নামেই ডাকে মিয়ানমার কর্তৃৃপক্ষ। বছরের পর বছর বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশটিতে বসবাস করে এলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *