পথে পথে রোহিঙ্গা

টাইমস আই বেঙ্গলী ডকটম, শাহপরী দ্বীপ টেকনাফ থেকে : টেকনাফ থেকে ৩১ কিলোমিটার আগেই মেরিন ড্রাইভে দেখা মিললো রাস্তার দুই পাশ্র্বে প্রায় শ’ খানেক রোহিঙ্গা শরণার্থীর। যাদের মধ্যে ৫ থেকে ১৪ বছরের শিশুর সংখ্যা বেশি। তাদের কেউ কেউ গত বুধ ও বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করেছে। কিছুদূর যেতে না যেতেই আবারও দেখা মিললো রোহিঙ্গাদের। এভাবেই টেকনাফ পর্যন্ত দেখা মিললো অসংখ্য রোহিঙ্গা শরণার্থীর যারা রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছে। গাড়ি দেখলে হাত বাড়িয়ে দেয় কিছু পাওয়ার আশায়। আর উখিয়ার বালুখালী থেকে কুতুপালং পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৭ কিলোমিটার সড়কের দুই ধারে হাজার হাজার রোহিঙ্গা ত্রাণের জন্য বসে আছেন। একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি ও তাদের সন্তানরা বিভিন্ন স্থানে বসে থাকেন। যাতে বেশি বেশি ত্রাণ সংগ্রহ করা যায়। কিছুক্ষণ কোনো সড়কে দাঁড়ালেই যে কারও চোখে এই দৃশ্য ধরা পড়বে। উখিয়ার বালুখালী, থ্যাংখালী, পালংখালী এবং টেকনাফের উনছিপ্রাং, নয়াবাড়ি এলাকার রাস্তার দু’ধারে এখন কেবল রোহিঙ্গাই চোখে পড়ে। সব নারী আর শিশু। নারীরা বোরকা পরে সারাদিন ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে রাস্তার পাশেই বসে থাকেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা গাড়ি সাধারণত তাদের ত্রাণ দিয়ে থাকে। গাড়ি থেকে দেয়া ত্রাণ নিতে রীতিমতো যুদ্ধে নেমে পড়েন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুরা। কারণ মানুষের তুলনায় ত্রাণের পরিমাণ খুবই কম। গায়ে শক্তি যার বেশি তিনিই ‘ত্রাণ যুদ্ধে’ জিতে যাচ্ছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, শাহ পরীর দ্বীপে রোহিঙ্গাদের নৌকা ভীড়েছে গতকালও। তবে গত কয়েকদিনের তুলনায় রোহিঙ্গাদের আসার স্র্রোত কিছুটা কমেছে। যারা গত শুক্রবার রাতে নাফ নদী অতিক্রম করে শাহপরীর দ্বীপে অবস্থান নিয়েছিলো। তারা গতকাল শনিবার শাহপরীর দ্বীপ থেকে নয়াবাড়ি যাচ্ছিলেন। নয়াবাড়ি এলাকায় রোহিঙ্গাদের ট্রলার ভেড়ার সাথে সাথেই তাদের হাতে খাদ্য সামগ্রী ও নগদ টাকা দিচ্ছেন অনেকেই।

এই সাহায্যের হাত পাশে থাকছে উখিয়া পর্যন্ত। রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত সব ধরনের সহযোগিতা করছেন বাংলাদেশের মানুষ। তবে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের কাছে গিয়ে আর ক্যাম্পে প্রবেশ করেন না। রাস্তাতেই থাকেন। কারণ ত্রাণ। কোনোভাবেই তাদের রাস্তা থেকে সরানো যাচ্ছে না। এ দিকে, এখন নতুন আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে পুরনো রোহিঙ্গারাও ত্রাণ নিতে রাস্তায় বসে গিয়েছেন। কুতুপালংয়ের নিবন্ধিত ক্যাম্পের রোহিঙ্গারাও এখন ত্রাণের জন্য রাস্তায় চলে এসেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। বালুখালী ঢাল থেকে নেমে একটু সামনে গিয়েই দেখা যায় রাস্তার পাশেই পলিথিন দিয়ে সারি সারি ঘর তুলেছেন রোহিঙ্গারা। এ রকম একটি ঘরে ছোট ছোট দুই ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে বসে আছেন রমজানবিবি। তিনি বলেন আমরা পাহাড়ে জায়গা পাইনি তাই রাস্তার পাশেই ঘর পেতে বসে আছি। বস্তি সংলগ্ন এলাকায় দেখা গেছে, প্রতিদিন অন্তত দুই বেলা রোহিঙ্গাদের ভাষায় বস্তি সংলগ্ন এলাকায় মাইকিং করা হয়। মাইকিং করে রোহিঙ্গাদের সড়ক থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তবে রোহিঙ্গারা তা পাত্তাই দিচ্ছে না। তারা কোনো গাড়ি দেখলেই ছুটে আসেন। যারা ত্রাণ দেন তারাও রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ত্রাণ দিয়ে চলে যাচ্ছেন। এ ভাবে ত্রাণ নিতে গিয়ে অনেক রোহিঙ্গা আহতও হচ্ছেন।

এ দিকে রোহিঙ্গাদের এক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কঙ্বাজার জেলা প্রশাসন। এ ব্যাপারে কঙ্বাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাহিদুর রহমান বলেন, সমন্বয় করে ত্রাণ দেয়ার কাজও চলছে। ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকই রাস্তায় রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিচ্ছেন। তারা যাওয়ার সময় গাড়ি থেকে ত্রাণ দিচ্ছেন। তাদেরও নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কারণ এ কারণে রোহিঙ্গারা রাস্তাতেই থাকছে।

গতকাল শনিবার নয়াবাড়ি এলাকায় বিতরণ করতে দেখা গেছে বেসরকারি উদ্যোগে বেশকিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে। তাদের মধ্যে আমরা পুরনো ঢাকাবাসীর একজনের সঙ্গে কথা হয়। সরকারিভাবে সমন্বয় করে দেয়ার কথা বলা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐ ব্যক্তি বলেন, আমরা আমাদের সমর্থ অনুযায়ী যতটুকু পারছি নিজ হাতে বিতরণ করছি। এই ত্রাণ যদি সরকারের কোষাগারে জমা দেয়া হয় তবে কতটুকু এসব রোহিঙ্গা শরণার্থীরা পাবে তা নিয়ে আমরা যথেষ্ট সন্দিহান। এ দিকে মায়ানমার থেকে আগত রোহিংগা শরনার্থীরা টেকনাফ ছাড়াও কঙ্বাজারের বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া রোধে চট্টগ্রামে ২৭টি চেকপোস্ট স্থাপন করা হলেও পর্যটন নগরী কঙ্বাজারে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এ দিকে, উখিয়ায় আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা যাতে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকায় ২৭টি চেকপোস্ট বসিয়েছে পুলিশ। শনিবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি এস এম মনির-উজ-জামান। তিনি বলেন, আমরা নজরদারি বাড়িয়েছি। তাই মূল ভূখ-ে ছড়িয়ে পড়ার কোনও সুযোগ নেই।

মায়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক দমন-পীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ার কয়েকটি ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর পুলিশ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি এস এম মনির-উজ-জামান বলেন, আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা যেনো কঙ্বাজার থেকে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য আমরা কাজ করছি। তারা যেনো কোনো অবস্থাতেই মূল ভূখ-ে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশসহ প্রশাসন সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে। ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পুলিশের পক্ষ থেকে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে মোট ২৭টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *